ওসমানীয় সালতানাতের স্বর্ণযুগের কাহিনি বৃত্তান্ত।
31 May 2026 • ইসলামি বিশ্ব

ইসলামি ডেস্ক:
হুমা খাতুন তাঁর বালক ছেলেকে নিয়ে প্রতিদিন বিকালে মর্মর সাগর পাড়ে যেতেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝির ঘটনা। সেখানে গিয়ে তার ছেলেকে বলতেন, সমুদ্রের ঐ পাড়ে যে শহর আছে, তোমার পূর্বপুরুষরা অনেক চেষ্টা করেছে জয় করবার, কিন্তু পারেননি। তোমাকে সেই শহর বিজয় করতে হবে।
ছোট বালকের মস্তিষ্ক ভাবতে থাকে, তাঁর বংশ গত একশ বছর ধরে আনাতোলিয়া ও বলকানের শাসক। কি এমন আছে সেই শহরে, যার জন্য তাঁর পূর্বপুরুষরা এতবার জয় করার চেষ্টা করেছিলেন। আর কেনই বা তারা সমর্থ হন নি।
সেই শহরকে নিয়ে অনেক লোক-আখ্যান তৈরি হয়েছে গত কয়েক শ বছরে।
১) শহরটি যেদিন বিজিত হবে, সেরাতে পূর্ণিমার রাত থাকবে।
২) নগরীর প্রতিষ্ঠাতা এবং বিজিত হবার পূর্বের সম্রাটের নাম একই হবে।
৩) যেই বাদশাহ শহরটি জয় করবেন, তাঁর নাম হবে এক জন নবীর নামে।
৪) শহরটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এত দুর্ভেদ্য ছিল যে, মানুষের মধ্যে প্রবাদ ছড়িয়ে গিয়েছিল, যদি জমিনে জাহাজ চলে কেবল তখনই শহরটি বিজয় করা সম্ভব হবে।
৫) নগরী বিজিত হবার আগে চন্দ্রগ্রহণ হবে।
এক যুগ পেরিয়ে গেল। সেই ছোট বালক এখন একুশ বছরের নওজোয়ান। তাঁর মনে আছে মায়ের অসিয়তের কথা। তাঁর কাঁধে এখন গোটা এক সালতানাতের দায়িত্ব। কিন্তু শহরটি জয় করা এত সহজসাধ্য নয়, যার ইস্পাতকঠিন দেয়াল গত ১১০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
সিংহাসনে বসে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের সবচেয়ে বড় ভাবনা, কিভাবে কন্সটান্টিনোপল জয় করবেন। বলকান থেকে আনাতোলিয়া, সমগ্র রাজ্য থেকে সৈন্য সংগ্রহ করলেন আশি হাজার। এর মাঝে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি হলো।
হাঙ্গেরির ইঞ্জিনিয়ার ওরবান বানিয়েছিলেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী কামান ‘The Mighty Basilica’। ব্যাসিলিকার ওজন ছিল ১৯ টন। ব্যারেল ছিল ১৯ ফিট লম্বা। গোলার রেঞ্জ এক মাইল। একেকটি গোলা ২৫০ কেজি ওজনের। ব্যাসিলিকাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরাতে প্রয়োজন হতো ৩০ জোড়া ষাঁড় আর ৪০০ সৈন্যের। ওরবান এই কামান বিক্রি করতে চেয়েছিলেন বাইজেন্টাইনদের কাছে। কিন্তু বাইজেন্টাইনরা ব্যাসিলিকা উচ্চ মূল্য শুনে রিজেক্ট করে দিল। ওরবান তখন সুলতান মুহাম্মদ খানের দরবারে যান। মুহাম্মদ কামানের কদর বুঝতে পারেন এবং ব্যাসিলিকা কিনে নেন।
১৪৫৩ সালের এপ্রিলের শুরুতে কন্সটান্টিনোপল অবরোধ করেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ। কন্সটান্টিনোপলকে বলা হতো বেস্ট ডিফেন্ডেড সিটি ইন দ্যা হিস্ট্রি। এর পর্বতসম থিওডিসিয়ান ওয়াল ভাঙতে পারেনি কেউ। মহানবীর (সা) ভবিষ্যদ্বাণী আছে এই শহরকে নিয়ে। ‘নিশ্চয়ই কন্সটান্টিনোপল বিজিত হবে। সেজন্য মুহাম্মদ খান শহর জয় করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন।
সুলতান মুহাম্মদের নির্দেশে একদিন হাজার হাজার গাছ কাটা হলো। গাছগুলোর উপর চর্বি মাখিয়ে বিছানো হলো গোল্ডেন হর্নের পাহাড়ী উপত্যকার উপর। চর্বিযুক্ত গাছের উপর দিয়ে মুহাম্মদ তার নৌবাহিনীকে আদেশ দিলেন জাহাজগুলোকে শক্ত চেইনের সাহায্যে টেনে নিয়ে গোল্ডেন হর্নের অপর প্রান্তে পৌঁছাতে। ঝাঁকে ঝাঁকে জাহাজ গোল্ডেন হর্ন পার হলো। স্থল ও নৌপথে শক্তভাবে কন্সটান্টিনোপল অবরোধ করলেন মুহাম্মদ।
পৌনে দুই মাস চেষ্টা করেও কন্সটান্টিনোপলের দেয়াল ভাঙতে পারলেন না মুহাম্মদ। ব্যাসিলিকা কামানের গোলা, আশি হাজার সৈন্য এবং জমিন দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া জাহাজ কোনো কিছুই কাজে আসছে না। মুহাম্মদ প্রায় হাল ছেড়ে দিলেন।
মুহাম্মদকে সান্ত্বনা দিলেন তাঁর ওস্তাদ আঁকা শামসউদ্দিন। মুহাম্মদ খানকে মহানবী (সা) এর মেজবান ও পতাকাবাহক সাহাবী আবু আইয়ুব আনসারী (রা) এর অসিয়ত শোনালেন আঁকা শামসউদ্দিন। আবু আইয়ুব আনসারীর কবর ছিল কন্সটান্টিনোপলের বাহিরে। মৃত্যুকালে তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল, কন্সটান্টিনোপলের মাটি তাঁর কবরে ছড়িয়ে দিতে। মুহাম্মদ খান এবার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। পূর্ণ উদ্যমে কন্সটান্টিনোপলের উপর চার্জ করার নির্দেশ দিলেন।
এর মাঝে দুইটা ঘটনা মুহাম্মদ খান ও উসমানী ফৌজের আত্ববিশ্বাস বাড়িয়ে দিল। ২২ মে রাতে চন্দ্রগ্রহণ হলো। বাইজেন্টাইনরা একে বিপদের নিশান মনে করত। ২৫ মে ভোরবেলায় আবু আইয়ুব আনসারী (রা) কবর খুঁজে পাওয়া গেল।
২৮ মে দিবাগত রাতে পূর্ণিমার চাঁদ দেখা দিল। উভয়পক্ষ গভীর প্রার্থনায় মগ্ন। ২৯ মে সুবহে সাদিকের ওয়াক্তে মুহাম্মদ তাঁর স্থলবাহিনীকে সর্বাত্মক আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। গর্জে উঠল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কামান, দ্যা ব্যাসিলিকা। কন্সটান্টিনোপলের দেয়ালে ব্যাসিলিকার তিনটি গোলা পরপর একই নিশানায় আঘাত করে। দেয়ালে বড় ফাটল দেখা দেয়। ঝাঁকে ঝাঁকে তুর্কী সৈন্য ঢুকতে লাগল।
আনাতোলিয়ার সিপাহীদের নেতা উলুবাতলি হাসান মই দিয়ে দেয়ালের চূড়ায় উঠে গেলেন। তিনি শুনেছেন প্রথম মুসলমান যে কাইজারের শহরে প্রবেশ করবে সে জান্নাতে যাবে। তীরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে পতাকা ধরে রাখলেন হাসান। বুক ভেদ করা গুলিতে শহীদ হয়ে গেলেন। মৃত্যুকালে দাঁতে দাঁত চেপে উঁচু করে ধরে রাখলেন কালেমা খচিত পতাকা। তুর্কী বাহিনীর হিম্মত ও মনোবল বেড়ে যায়।
প্রমাদ গুণতে লাগলেন বাইজাইন্টাইন সম্রাট কন্সটান্টাইন। কারণ শহরের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম কন্সটান্টাইন এবং তার নাম একই। জনৈক তুর্কি সৈন্যের তীরের আঘাতে মারা গেলেন সম্রাট একাদশ কন্সটান্টাইন।
১৪৫৩ সনের ২৯ মে বিকালে শহরে প্রবেশ করলো উসমানীয় বাহিনী। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ খান আয়াসোফিয়া চার্চে গিয়ে নামাজ আদায় করলেন এবং সবাইকে নিরাপত্তা দান করলেন। উলুবাতলি হাসানের লাশ পূর্ণ সম্মানের সাথে নামানো হলো। তাঁর শরীরে বিঁধেছিল সাতাশটা তীর আর ৬ টা গুলি। মুখে ছিল না কোনো যন্ত্রনার ছাপ।
আল্লাহর রাসূলের (সা) ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হলো এবং আবু আইয়ুব আনসারীর (রা) অসিয়ত পূরণ হলো। দুই মহাদেশের শহরে পতপত করে উড়তে লাগল সিতারা-হিলাল আর কালেমা খচিত উসমানীয় সালতানাতের পতাকা। দ্বিতীয় মুহাম্মদ খানকে দুনিয়া চিনতে লাগল আল ফাতিহ (অর্থাৎ মহাবিজেতা) হিসেবে।
তথ্য:
সংগৃহিত।
ছবি: উইকিপিডিয়া।
