আমি বরিশালের ছেলে যদিও আমার জন্ম ০১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, কলকাতায়–নচিকেতা চক্রবর্তী!
04 Sep 2026 • সারাদেশ

রেজাউল করিম মুকুলঃ
কুঁড়েঘরের বারান্দার মাটির মেঝেতে বসে কান্না লুকানোর বৃথা চেষ্টা করেও পারলেন না নচিকেতা। কালো সানগ্লাসের ফাঁক গলে অশ্রু গড়িয়ে এলো। বাড়ির দিঘিরপাড়ে, কখনো পৈতৃক ভিটায় বসে নীরবে চোখের জল ফেললেন তিনি। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কাটাখালী খালের পানি বোতলে ভরে নিয়ে গেলেন
ভারতের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী নচিকেতাকে এভাবে দেখে অবাক হয়েছেন বরিশালের পিরোজপুরের চেচরীরামপুর গ্রামের মানুষ। এই গ্রামেই যার শেকড় এমন একজন মানুষ তাদের সামনে দাড়িয়ে কাঁদছে, গ্রামবাসীরও চোখে পানি চিক চিক করে। নচিকেতার দাদু (মায়ের বাবা) ললিত মোহন গাঙ্গুলী বিহারী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৫৮ সালে তিনি এ বিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। দাদুর স্মৃতি বিজড়িত বিদ্যালয়ে এসে নচিকেতা আবেগে শিশুর মতো কাঁদতে থাকেন। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শংকর দাস তাঁকে বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের একটি স্মরণিকা উপহার দেন। এখান থেকে সড়কপথে গেলেন মাত্র চার কিলোমিটার দূরে কাঁঠালিয়ার চেচরীরামপুর গ্রামে। এখানে বসবাস করতেন নচিকেতার বাপ-দাদার পরিবার। বাবা সখারঞ্জন চক্রবর্তী ১৯৪৫ সালে সপরিবারে ভারত চলে যান। নচিকেতা সাংবাদিকদের বলেন, এখানে এসেছি নাড়ির টানে। সময় পেলে আবার আসব,, আপনাদের ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ হয়েছি। আপনারা আমার আপনজন। আমি বরিশালের ছেলে যদিও আমার জন্ম ০১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, কলকাতায়। পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের বরিশালের ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার চেচরীরামপুর গ্রামে।
২৬ জুলাই ২০২৪খ্রি.ঢাকায় আসার কথা ছিলো নচিকেতার। ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো ‘নচিকেতা লাইভ ইন ঢাকা উইথ জয় শাহরিয়ার। আজব রেকর্ডস ও আজব কারখানার ৩০ বছর পূর্তিতে গত বছর নভেম্বরে ঢাকায় একক কনসার্ট করেছিলেন নচিকেতা। গতবার ওই কনসার্টে নচিকেতার সঙ্গে গেয়েছিলেন জয় শাহরিয়ার। এবারও নচিকেতা ঢাকাবাসীকে গান শোনাতে আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু হলো না। ঢাকায় শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক অস্থিরতা,একটা রাজনৈতিক ঝড়ো বাতাস।
নচিকেতা বলেছেন তিনি তাঁর ছেলেবেলায় যার গান শুনে প্রেমে পড়েছিলেন তিনি হলেন গায়িকা রুনা লায়লা। নচিকেতা তিনশতরও বেশি গান রচনা করেছেন এবং সুর করেছেন, কন্ঠও দিয়েছেন। এ পর্যন্ত ১৮টি একক অ্যালবাম বেরিয়েছে। মিশ্র অ্যালবাম আছে ১১টি। এ ছাড়া চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক তো অনেক।তিনি তরুণদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, যা ধীরে ধীরে সব বয়সের শ্রোতাকে স্পর্শ করতে পেরেছিলো। চলিত ভাষার ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাংলা গানের প্রাচীন ধারণাকে পরিবর্তন করেছেন।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হঠাৎ বৃষ্টি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন নচিকেতা। সেই চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘একদিন স্বপ্নের দিন’ দুই বাংলার শ্রোতাদের মুখে মুখে আজও ফিরে। এই গানটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে একঝলক নতুন হাওয়াও এনে দিয়েছিলো। নচিকেতার অনেক গানের মধ্যে গল্প খুঁজে পাওয়া যায়। বেশ কিছু গল্প লিখেছেনও। ক্যকটাস ও জন্মদিনের রাত নামের দুটো উপন্যাসও আছে তার। জ্যাক লন্ডন, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং হুমায়ুন আহমেদ তাঁর প্রিয় লেখক।
বরিশালের আর এক সন্তান জীবনানন্দ দাস। তিনিও তার কবিতায় অমরত্ব দিয়েছেন ধানসিড়ি, ধলেশ্বরী বা সন্ধ্যা নদীর বেষ্টনীর মধ্যে নাটোর শহরটিকে।কবির স্কুলের খেলার মাঠ, ব্রজমোহন কলেজের মাঠের পাচিলের ওপাশেই ছিলো লাশকাটা ঘর, অদূরেই বগুড়া রোডের এক বাঁকা চাঁদের মতো রাস্তার বাঁকে কবির বাড়ি- ধানসিড়ি, পাশেই ছিলো মন্তাজ মিঞার আস্তাবল। ‘‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে।’’ পূর্ণিমার রাতে মাঠ ভেসে যায় জ্যোৎস্নায় আর মিঞার ঘোড়ারা সেই আলো-অন্ধকারে ঘাস খায়। ‘ঘোড়া’ নামের কবিতায় আজো বেচে আছে মহিন ও তার ঘোড়াগুলো। জীবনানন্দের শব্দগুলো ঘাস, পাতা, গাছ, আকাশ, নদী, দোয়েল, প্যাচা, ইঁদুর, আর জলাঙ্গীর ঢেউ হয়ে আজো কথা বলে নবীন পাঠকের সাথে। “আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন”- কবির মনের গহিনে বাস করে এক বনলতা সেন? কবি সুরঞ্জনাকে সাবধান করেছিলেন-
সুরঞ্জনা, ওইখানে যেও নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
দূর থেকে দূরে— আরো দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেও নাকো আর।
কে এই সুরঞ্জনা? জীবনানন্দের এই সুরঞ্জনা, তাকেও আমরা চিনি না। বরিশালে শেকড় যার সেই গীতিকার, সুরকার ও গায়ক নচিকেতা তার মেয়ের নাম রেখেছেন ধানসিড়ি, তিনিও টেনে এনেছেন তার গানে এক নীলাঞ্জনাকে- কে এই নীলাঞ্জনা?
হাজার কবিতা, বেকার সবই-তা
তার কথা কেউ বলে না
সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা।
তিনিও বাচিয়ে রাখতে চান তার মাতৃভূমি, পিতৃভূমিকে এভাবে গানে ও কবিতায়।
