উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ রবিন ঘোষ এবং কিছু না বলা কথা
22 Jun 2026 • বিনোদন

বিনোদন ডেস্ক :
“আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন”, “পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি”, “আমি রূপনগরের রাজকন্যা”, “তোমারে লেগেছে এত যে ভালো”— বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের এই গানগুলো শোনেননি, এমন বাঙালি হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষের মুখে মুখে ফেরে এই সুর। কিন্তু যিনি তার জাদুকরী আঙুলের ছোঁয়ায় এই কালজয়ী সুরগুলো বেঁধেছিলেন, তাকে কি আমরা চিনি?
তাঁর নাম রবিন ঘোষ। এক অদ্ভুত আক্ষেপের নাম, এক চরম অভিমানের নাম।
যে দেশে জন্ম, সে দেশেই তিনি অচেনা!
বাংলাদেশিরা এই অসামান্য প্রতিভাধর মানুষটিকে সেভাবে মনে না রাখলেও, পাকিস্তানিরা কিন্তু তাঁকে রীতিমতো মাথায় করে রাখত। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম তাঁকে তুলনা করত ভারতের বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক আর. ডি. বর্মণের সাথে! কেউ ডাকত ‘পাকিস্তানের নওশাদ’। এমনকি ২০১২ সালেও পাকিস্তান টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী (বিখ্যাত অভিনেত্রী শবনম) লালগালিচা সংবর্ধনা ও আজীবন সম্মাননা দেন।
বাগদাদ থেকে পুরান ঢাকা: এক সুরসাধকের বেড়ে ওঠা
১৯৩৯ সালে ইরাকের বাগদাদে জন্ম রবিন ঘোষের। বাবা ছিলেন হিন্দু, মা বাগদাদি ক্যাথলিক খ্রিস্টান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ছোট্ট রবিন ঢাকায় চলে আসেন। তবে বাবার বিচ্ছেদের পর মায়ের কাছেই পুরান ঢাকার ওয়ারীতে বড় হন তিনি। ছোটবেলা থেকেই চার্চের গায়কদল আর গ্রামোফোনের রেকর্ডের সাথে তাঁর সখ্যতা। সেখান থেকেই মিউজিক কলেজে পড়াশোনা এবং রেডিওতে চাকরি।
সঙ্গীত ও প্রেম
পঞ্চাশের দশকে এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয় টুকটাক অভিনয় করা এক মেয়ের সাথে। সেই মেয়েটিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন উপমহাদেশের বিখ্যাত অভিনেত্রী শবনম। ১৯৬৪ সালে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা এহতেশামের হাত ধরে ১৯৬১ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে রবিন ঘোষের যাত্রা শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
পাকিস্তানে সাফল্যের চূড়ায়
স্ত্রীর উর্দু ছবির ক্যারিয়ারের সুবাদে ১৯৬৮ সালে তাঁরা করাচি চলে যান। সেখানে ‘তালাশ’, ‘চকোরি’, ‘আয়না’-র মতো ব্লকবাস্টার সব উর্দু ছবিতে সুর দেন রবিন। পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ইতিহাসের প্রথম প্লাটিনাম জুবিলি ছবি ‘আয়না’-র সাফল্যের মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে রেকর্ড ৬ বার ‘নিগার অ্যাওয়ার্ড’ জিতে নেন এই বাঙালি সুরকার। তাঁর সুর এতই মিষ্টি ছিল যে, পাকিস্তানে তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল “সিরাপি”!
বুকভরা অভিমান আর নীরবে প্রস্থান
১৯৯৮ সালে রবিন ঘোষ স্থায়ীভাবে ঢাকায় ফিরে আসেন। কিন্তু যে দেশে তিনি জন্মেছিলেন, যে দেশের জন্য এত কালজয়ী সুর বেঁধেছিলেন, সেই দেশ তাঁকে মনে রাখেনি। নতুন প্রজন্মের পরিচালকরা তাঁর কাছে যাননি, আর তিনিও গায়ে পড়ে কাজ চাইতে পারেননি। দেশে তখন নকল গানের ছড়াছড়ি। তাই গুলশানের বাড়িতে পত্রিকা পড়ে আর টিভি দেখেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন।
২০১৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি যখন চিরবিদায় নেন, তখন তাঁর অভিমানের পাল্লাটা কত ভারী ছিল জানেন? মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ যেন বিএফডিসিতে (BFDC) নেওয়া না হয়— এটাই ছিল তাঁর শেষ ইচ্ছা! ওয়ারীর খ্রিস্টান কবরস্থানে নীরবে শায়িত করা হয় এই কিংবদন্তিকে।
বরেণ্য শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “দুঃখ হয়, কেউ তাঁর কোনো খোঁজখবর নিত না। আমরা তাঁকে মূল্যায়ন করতে পারিনি।” আমরা হয়তো মানুষ রবিন ঘোষকে সম্মান দিতে পারিনি, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি করা সুরগুলো আমাদের অজান্তেই প্রতিদিন আমাদের ঠোঁটে বেজে ওঠে। একজন প্রকৃত শিল্পীর জয় তো সেখানেই।
সংগৃহিত তথ্য :
