বুধবার, 28 অক্টোবর 2026 · 04:01
সত্য ও ন্যায়ের পথে আপসহীনজনতার কণ্ঠস্বর, মানুষের খবর

ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং তুর্কী সেনাদের বীরত্ব গাঁথা।

23 May 2026 • সারাদেশ

ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন এবং তুর্কী সেনাদের বীরত্ব গাঁথা।

ডেস্ক রিপোর্ট :
সালটা ঁছিল ১৮৭১। ওসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রধান ছিলেন সে সময়ের অন্যতম শক্তিশালী সুলতান, সুলতান আব্দুল আজিজ। এই সময়ে ওসমানীয় সেনাবাহিনী বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী হিসেবে স্বীকৃত ছিল। সুলতান আব্দুল আজিজ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাই তিনি সামরিক খাতে বিশাল বিনিয়োগ করছিলেন এবং বিশ্ব অস্ত্র শিল্পের ওপর নিবিড় নজর রাখছিলেন।
​ সেই বছর ইংল্যান্ডে ‘মার্টিনি-হেনরি’ (Martini-Henry) নামে একটি রাইফেল তৈরি হয়। সে সময় বিশ্বের রাইফেলগুলোর পাল্লা ছিল মাত্র ২০০ মিটার, কিন্তু মার্টিনি রাইফেলের পাল্লা ছিল ৫০০ মিটার পর্যন্ত। সুলতান আব্দুল আজিজ দূরদর্শী হওয়ায় বুঝতে পেরেছিলেন যে যুদ্ধে এই রাইফেলগুলো অত্যন্ত কার্যকর হবে। কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ খরচ না করেই সাহায্য ও নিলামের মাধ্যমে তিনি ১টি মার্টিনি-হেনরি রাইফেল প্রসাদে নিয়ে আসেন। তিনি সেটি তোপখানায় দিয়ে নির্দেশ দেন যেন এটি পরীক্ষা করে হুবহু একই রকম রাইফেল তৈরি করা হয়।
​এভাবেই তোপখানায় শূন্য থেকে মার্টিনি-হেনরি রাইফেল তৈরি করা শুরু হয় এবং তা ওসমানীয় সৈনিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই রাইফেলটিকে তুর্কি ভাষায় ‘আয়নালি মার্টিন’ (Aynalı Martin) বলা হতো। ওসমানীয় সেনাবাহিনী প্রস্তুত ছিল, রাশিয়ার জেতার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকরা তা হতে দেয়নি।
​ মিদহাত পাশা নামে একজন (যিনি বুলগেরিয়াপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন) এবং তার সহযোগীদের দ্বারা ১৮৭৬ সালের ৩০ মে সুলতান আব্দুল আজিজের বিরুদ্ধে একটি কাপুরুষোচিত অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। সুলতানকে সিংহাসনচ্যুত করা হয় এবং পরবর্তীতে তাকে শহীদ করে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়। এটি ছিল ওসমানীয় ইতিহাসের একটি বড় ক্রান্তিকাল।
​শাহজাদা আব্দুল হামিদ তার চাচার সাথে হওয়া এই বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছিলেন, কিন্তু যেহেতু ক্ষমতা তখন মিদহাত পাশা ও ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে ছিল, তাই তাকে কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছিল। মিদহাত পাশারা চাইছিলেন ওসমানীয় শাসনব্যবস্থাকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করতে। তারা এমন একজনকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিলেন যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেই ব্যক্তিটি ছিলেন শাহজাদা দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ।
​ অভ্যুত্থানকারী সেনাবাহিনী কখনো যুদ্ধ করতে পারে না, কারণ তাদের শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটে। যেখানে একজন ক্যাপ্টেন একজন জেনারেলের সামনে দাপট দেখায়, সেখানে সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। সুলতান আব্দুল আজিজ যে বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। ওসমানীয়-রুশ যুদ্ধ তখন দোরগোড়ায়। সুলতান আব্দুল হামিদ সবে সিংহাসনে বসেছেন, আর মিদহাত পাশারা চাইছিলেন যুদ্ধ শুরু করতে।
​আব্দুল হামিদ যুদ্ধ এড়াতে শান্তি প্রস্তাবের জন্য টেলিগ্রাম করার নির্দেশ দিলেও যুদ্ধ থামানো যায়নি। রুশরা ১৮৭৭ সালের ২৪ এপ্রিল যুদ্ধ ঘোষণা করে। রুশদের বাহিনী ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার সৈন্যের। অন্যদিকে ওসমানীয়দের ছিল ৪ লাখের মতো। কৃষ্ণসাগরে নৌবাহিনীর প্রাধান্য ছিল ওসমানীয়দের হাতে। রুশদের লক্ষ্য ছিল বলকান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করা এবং ইস্তাম্বুলের দিকে এগিয়ে আসা।
​ওসমানীয়দের পরিকল্পনা ছিল রক্ষনাত্মক। কিন্তু রুশরা একের পর এক শহর দখল করতে থাকে। বুলগেরিয়ায় তুর্কিদের ওপর ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। এই বিপর্যয়ের মুখে ইস্তাম্বুলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অসফল জেনারেলদের সরিয়ে নতুনদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
​রুশদের বলকান পার হওয়ার জন্য এবং ইস্তাম্বুল পৌঁছানোর জন্য প্লিভনা (Plevne) দখল করা জরুরি ছিল। কারণ এটি ছিল অনেকগুলো রাস্তার সংযোগস্থল। ওসমান পাশা এই প্লিভনাকে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছিলেন। তার কাছে মাত্র ৪০ হাজার সৈন্য ছিল। ১৮৭৭ সালের ২০ জুলাই রুশরা প্রথমবার আক্রমণ করে এবং ওসমান পাশার কাছে পরাজিত হয়।
​ওসমান পাশার সৈন্যদের হাতে ছিল আয়নালি মার্টিন (৫০০ মিটার রেঞ্জ), আর রুশদের রাইফেলের পাল্লা ছিল মাত্র ২০০ মিটার। ফলে রুশরা কাছে আসার আগেই গুলিবিদ্ধ হচ্ছিল। ৩০ জুলাই রুশরা দ্বিতীয়বার বিশাল বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
​রুশরা এবার যে কোনো মূল্যে প্লিভনা দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা রোমানিয়ার সহায়তায় ১ লাখ সৈন্য ও ৪৫০টি কামান নিয়ে তৃতীয়বার আক্রমণ করে। তুর্কিদের সৈন্য ছিল মাত্র ২৫ হাজার। জার এর (Tsar) জন্মদিন ( রাশিয়ার সম্রাট)উপলক্ষে এই আক্রমণ শুরু হয়। রুশরা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে কিছু জায়গা দখল করলেও ওসমান পাশা ও তার সৈনিকদের অসীম সাহসিকতায় তারা শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। রুশ জার নিজের চোখের সামনে নিজের বাহিনীর এই অবস্থা দেখে চোখের জল ফেলেছিলেন।
​ সরাসরি যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে রুশরা এবার প্লিভনা অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। চারদিক থেকে ঘেরাও করে খাবার ও রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্লিভনার সৈনিকদের মধ্যে ক্ষুধা ও চিকিৎসার অভাব দেখা দেয়। রুশরা ওসমান পাশাকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
​অবশেষে ক্ষুধা ও অভাবের কাছে হার মানার চেয়ে একটি শেষ যুদ্ধের (Breakout attempt) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৪২ হাজার তুর্কি সৈন্য ১ লাখ ৩০ হাজার রুশ ও রোমানীয় সৈন্যের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা দুটি ব্যুহ ভাঙতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। প্লিভনার বীররা হয়তো যুদ্ধের ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারেননি, কিন্তু তারা তুর্কি সেনাবাহিনীর সামরিক মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।
# ইতিহাসের অলি গলি থেকে তথ্য সংগৃহীত।
ছবি: উইকিপিডিয়া।

আরও পড়ুন

পলিমাটির চাদরে যমুনার তীরে, তিল চাষে নতুন বিপ্লব নীড়ে!

ইয়েমেনে জ্বালানি ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র সংকটে শহরটির হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে!

চিকিৎসা সেবায় যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রযুক্তিঃরোবোটিক সার্জারির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে জটিল সকল অপারেশন!

বাউফলে(পটুয়াখালী) ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল কার পকেটে?

ক্ষমতা আর কারাগার এই দুই মেরুর মাঝখানে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অবস্থান!

জনরোষে উত্থাল ফ্রান্সঃ চলমান বিক্ষোভ আন্দোলনে গ্রেপ্তার হাজার ছাড়িয়ে!