জেরুজালেম বীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি!
02 Sep 2026 • সারাদেশ

গুলশান উল হক সুমন:
ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের দেখা মেলে, যারা শুধু একটি যুগের স্রষ্টা নন, বরং মানবজাতির জন্য চিরন্তন আলোর মশাল। তেমনি এক দেদীপ্যমান নক্ষত্রের নাম সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবী। ইউরোপের খৃষ্টান ও প্রাচ্যের মুসলমানদের মধ্যে সংঘটিত ধর্মযুদ্ধ ক্রুসেডের (Crusade 1096-1291) রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিনগুলোতে যখন জেরুজালেমের আকাশ আঁধারে ঢাকা, ঠিক তখনই এক উদীয়মান সূর্যের মতো তাঁর আগমন ঘটে। তিনি শুধুমাত্র তরবারির ক্ষমতার সাহায্যে রাজ্য জয় করেননি, জয় করেছিলেন মানুষের হৃদয়। বীরত্ব, ক্ষমা এবং অনন্য মানবিক গুণের এক অপূর্ব সমন্বয় ছিলেন এই মহানায়ক। ইসলামের ইতিহাসে তো বটেই, এমনকি তাঁর শত্রুদের কাছেও তিনি ছিলেন এক শ্রদ্ধার পাত্র। আজ ইন্তেকালের ৮৩৩ বৎসর পরেও তাঁর গৌরবগাথা বিশ্ববাসীকে এক মহান, ন্যায়নিষ্ঠ ও উদার শাসকের গল্প শোনায়।
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ইসলামের ইতিহাসে তাঁর অসাধারণ সামরিক দক্ষতা, অতুলনীয় বীরত্ব, ন্যায়বিচার ও মহানুভবতার জন্য সর্বকালের সেরা নায়কদের একজন হিসাবে সম্মানিত। এই মহান সেনাপতি ছিলেন মিশর তথা প্রাচ্যের আইয়ুবি রাজবংশের (১১৭১-১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠাতা। ক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থায় মিশর, ইয়েমেন, মেসোপটেমিয়া, সিরিয়া, হেজাজ এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অংশ তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বাদশ শতকে ক্রুসেডারদের (খ্রিস্টান ধর্মযোদ্ধা) বিরুদ্ধে মুসলিম প্রতিরোধ গড়ে তুলে তিনি পবিত্র নগরী জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে মুক্ত করেছিলেন ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ আল-আকসা বা বায়তুল মুকাদ্দাস। কেবল একজন বীর যোদ্ধাই নন, তাঁর মহানুভবতা, ন্যায়পরায়ণতা, যুদ্ধনীতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে তিনি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে উভয় সমাজেই ছিলেন একজন কিংবদন্তি হিসেবে সমাদৃত।
সুলতান সালাহুদ্দিনের পূর্ন নাম আবু নাসির সালাহুদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব। তবে তিনি ‘সালাহুদ্দিন’ (ধর্মের সংস্কারক) বা ‘সালাহুদ্দিন আইয়ুবি’ নামেই ইতিহাসে সমধিক পরিচিত। পাশ্চাত্যে ইংরেজি উচ্চারণে তাঁকে সালাদিন Saladin নামে ডাকা হয়। তিনি ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরাকের তিকরিত শহরের এক সম্ভ্রান্ত কুর্দি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা। শৈশবে সালাহুদ্দিন বাগদাদ ও দামেস্কে ধর্মতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। তবে সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি বিশেষ পারদর্শিতা দেখান। তাঁর চাচা আসাদুদ্দিন শিরকু ছিলেন প্রখ্যাত মুসলিম শাসক নুরুদ্দিন জেংগি’র প্রধান সেনাপতি। চাচার তত্ত্বাবধানেই সালাহুদ্দিনের সামরিক জীবনের হাতেখড়ি হয়।
১১৬৩ খ্রিস্টাব্দে ফাতেমীয় খিলাফতের দুর্বলতার সুযোগে ক্রুসেডাররা মিশর দখলের চেষ্টা চালায়। তুর্কি বংশোদ্ভুত জেংগি রাজবংশীয় শাসক সুলতান নুরুদ্দিন জেংগি ক্রুসেডারদের হটাতে সালাহুদ্দিনের চাচা আসাদুদ্দিন শিরকু ও সালাহুদ্দিনকে মিশরে পাঠান। মিশরের উজির হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় শিরকু মারা যান। এরপর ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দে তরুণ সালাহুদ্দিন মিশরের উজির ও প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ফাতেমীয় খিলাফতের সমাপ্তি ঘটিয়ে মিশরে আইয়ুবি রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন এবং নুরুদ্দিন জেংগি’র প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে শাসনকাজ পরিচালনা করতে থাকেন।
১১৭৪ খ্রিস্টাব্দে সুলতান নুরুদ্দিন জেংগি’র মৃত্যুর পর মুসলিম বিশ্ব নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে এবং ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। সালাহুদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন, বিভক্ত মুসলিম শক্তি নিয়ে শক্তিশালী ক্রুসেডারদের পরাজিত করা অসম্ভব। তাই তিনি প্রথমে মুসলিম রাজ্যগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার উদ্যোগ নেন। কয়েক বৎসর এর মধ্যে তিনি সিরিয়া, উত্তর মেসোপটেমিয়া (ইরাকের অংশ) হেজাজ (পবিত্র মক্কা-মদিনা) নিজের শাসনের অধীনে এনে একটি অখণ্ড ও শক্তিশালী মুসলিম সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
কঠিন সময় কখনো বীর তৈরি করে না; বরং কঠিন সময়ে মানুষ নিজেই নিজের ভেতরকার বীরকে জাগিয়ে তোলে। নুরুদ্দিন জেংগি’র মৃত্যুর পরে সালাহুদ্দিনের নেতৃত্বকে দুর্বল ভেবে নিষ্ঠুর ও বিতর্কিত ফরাসি ক্রুসেডার সেনাপতি রেনল্ড অব চ্যাটিলন মুসলিম কাফেলাগুলোতে ক্রমাগত আক্রমণের করতে থাকে। সেই সাথে মুসলমানদের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা আক্রমণের উদ্ধত্যপূর্ণ হুমকি দিয়ে জেরুজালেমের খ্রিস্টান রাজার সঙ্গে সুলতান সালাহুদ্দিন কতৃক সম্পাদিত শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে। ফলশ্রুতিতে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১১৮৭ সালের ৪ জুলাই ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বাহিনী সালাহুদ্দিনের বিজ্ঞ নেতৃত্বে ঐতিহাসিক হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের মুখোমুখি হয়। সালাহুদ্দিনের সুনিপুণ যুদ্ধকৌশলের কাছে ক্রুসেডাররা নির্মমভাবে পরাজিত হয়। জেরুজালেমের রাজা ফরাসি নাইট গাই অব লুসিগনান এবং রেনল্ড অব চ্যাটিলন সহ শীর্ষস্থানীয় ক্রুসেডার নেতারা বন্দি হন। এই পরাজয়ের পরিণতিতে ক্রুসেডারদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
বায়তুল মুকাদ্দাসের মহান বিজেতা সুলতান সালাহুদ্দিন হাত্তিনের বিজয়ের পর পবিত্র নগরী জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। দীর্ঘ ৮৮ বছর পর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২ অক্টোবর (২৭ রজব, মিরাজের রাত) মুসলিমরা পুনরায় বায়তুল মুকাদ্দাস (আল-আকসা মসজিদ) সহ সম্পূর্ণ জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করে। ১০৯৬-১০৯৯ খ্রিস্টাব্দ ব্যাপী ফাতেমীয় খিলাফতের (৯০৯-১১৭২) অধীনে প্রথম ক্রুসেডের সময় খ্রিস্টানরা যখন জেরুজা♦লেম দখল করেছিল, তখন ইউরোপের যৌথ খ্রিষ্টান বাহিনীর ডিউক গডফ্রে অফ বুয়ঁ, রেমন্ড অফ সেন্ট-গিলস, ট্যাষ্করেড অফ হাউটভিল, রবার্ট অফ ফ্লান্ডার্স প্রমূখ সেনাপতির নেতৃত্বে হাজার হাজার মুসলিম ও ইহুদিকে নির্বিচারে হত্যা করে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল তারা। কিন্তু সালাহুদ্দিন জেরুজালেম বিজয়ের পর সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি কোনো প্রতিশোধ নেননি। সমস্ত সাধারণ খ্রিস্টানদের নিরাপদে শহরে বসবাসের অনুমতি দেন, বন্দিদের মুক্তিপণ মওকুফ করেন এবং ইহুদিদের পুনরায় জেরুজালেমে বসবাসের অধিকার ফিরিয়ে দেন। খ্রিষ্টান এবং ইহুদিদের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার বহাল রাখেন। সালাহুদ্দিনের এই অভাবনীয় ও নজিরবিহীন উদারতা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
সাহসিকতা মানে শুধু তলোয়ার হাতে দাঁড়ানো নয়, অনেক সময় ন্যায়ের পাশে নিরবে দাড়ানোও বীরত্ব। একবার যুদ্ধ চলাকালীন এক ক্রুসেডার নারী কাঁদতে কাঁদতে সুলতান সালাহুদ্দিনের তাবুতে এসে ফরিয়াদ করেন যে, মুসলিম যুদ্ধারা তার তিনমাস বয়সি শিশুপুত্রকে ভুলবশত অন্যত্র অন্য পরিবারের তত্ত্বাবধানে পাঠিয়ে দিয়েছে। নিখোঁজ শিশুর মায়ের কান্নায় নম্র সালাহুদ্দিন খুবই ব্যথিত হন, তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর সৈন্যদেরকে নির্দেশ দেন শিশুটিকে খুঁজে বের করার জন্য। সালাহুদ্দিন নিজের তহবিল থেকে টাকা দিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে এনে পুনরায় মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেন এবং তাদের নিরাপদে নিজস্ব খ্রিস্টান শিবিরে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেন।
১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের কাছে পরাজিত হয়ে জেরুজালেম হাতছাড়া হওয়ায় ক্ষুব্দ হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন রাজ্যের রাজা ও পোপ সমর্থিত সম্মিলিত খ্রিষ্টান বাহিনী জেরুজালেম পুনর্দখলের জন্য তৃতীয় ক্রুসেড (১১৮৯-১১৯২) ঘোষণা করে যুদ্ধ শুরু করে। জেরুজালেম পুনর্দখলের জন্য ইউরোপের সেরা যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত এই খ্রিষ্টান বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মহানুভব ও পরাক্রমশালী ইংরেজ রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট। দীর্ঘ তিন বৎসর ধরে সালাহুদ্দিন ও রিচার্ডের মধ্যে বেশ কয়েকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। রিচার্ড বর্তমান ইজরায়েলের ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় সমভূমি অঞ্চলে অবস্থিত ‘আক্কা’ শহর জয় করতে পারলেও বিচক্ষণ সালাহুদ্দিনের কঠোর প্রতিরোধের কারণে জেরুজালেম উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন।
যুদ্ধ মানে শুধু জয় নয়, কখনো কখনো লড়াই করে হার মানাটাও বীরত্ব। এক যুদ্ধে সিংহহৃদয় রিচার্ডের ঘোড়া মারা গেলে তিনি মাটিতে পড়ে গিয়ে হেঁটে যুদ্ধ করছিলেন। সালাহুদ্দিন তাঁর শত্রুকে এই অবস্থায় দেখে মোটেও আনন্দিত বা উৎসাহিত হননি। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝেই দূতের মাধ্যমে দুটি চমৎকার আরবীয় ঘোড়া রিচার্ডের জন্য উপহার হিসেবে পাঠান, যাতে তিনি রাজা হিসেবে সম্মানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারেন।
একজন মহান রাজার মহত্ব বোঝা যায় অন্য রাজার বিপদে তার আচরণ দেখে। যুদ্ধের একপর্যায়ে সিংহহৃদয় রিচার্ড ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সালাহুদ্দিন যুদ্ধ থামিয়ে দেন। মহত্বের নিদর্শন স্বরূপ শত্রুতার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর জন্য তাজা ফলমূল, বরফ এবং চিকিৎসার জন্য নিজের রাজকীয় চিকিৎসককে পাঠান। সালাহুদ্দিনের এই মহানুভবতা রাজা রিচার্ডকে মুগ্ধ করে। এই উদারতা পরবর্তীতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দরজা খুলে দেয়। সালাহুদ্দিন খ্রিষ্টান ও মুসলিম শিবিরের মধ্যেকার জটিল রাজনৈতিক সমীকরণকে এক অনুপম বীরত্ব ও দূরদর্শী কূটনৈতিক কুশলতায় পরিসমাপ্তি ঘটান। অবশেষে ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে দুই পক্ষের মধ্যে ‘রামলা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে জেরুজালেম মুসলিমদের অধীনেই থাকে তবে খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের জন্য শহরটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
সুলতান সালাহুদ্দিন এবং ক্রুসেড এর ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা নিয়ে বহু গল্প-উপন্যাস লিখা হয়েছে। তার অন্যতম প্রখ্যাত স্কটিশ উপন্যাসিক স্যার ওয়াল্টার স্কট রচিত ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস ‘দ্য তালিসমান'(The Talisman) তৎকালীন ইউরোপীয় সাহিত্যে মুসলমানদেরকে সাধারণত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হলেও এই উপন্যাসে সালাহুদ্দিন আইয়ুবীকে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ন, প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী, মার্জিত এবং উদার শাসক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। স্যার ওয়াল্টার স্কট এর প্রাঞ্জল বর্ণনা অনুযায়ী মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে সুলতান সালাহুদ্দিন নিজেই চিকিৎসকের ছদ্মবেশে শত্রু শিবিরে গিয়ে মহান প্রতিপক্ষ সিংহহৃদয় রিচার্ডের সেবা করেন।
‘এল হাকিম’ ছদ্মনামে সুলতানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক পরিচয়ে ছদ্দবেশী সালাহুদ্দিন খ্রিস্টান শিবিরে প্রবেশ করেন। তিনি সঙ্গে নিয়ে যান ‘তালিসমান’ নামের একটি বিশেষ অলৌকিক তাবিজ বা কবজ। রহস্যময় তালিসমান পানিতে ডুবিয়ে সেই পানি রিচার্ডকে পান করান, যার ফলে লায়নহার্ট অতিপ্রাকৃতভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই রোগ নিরাময়কারী দৈব তাবিজের নাম অনুসারে স্যার ওয়াল্টার স্কট ১৮২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাসের নামকরণ করেন তালিসমান।
সুলতান সালাহুদ্দিন এবং রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট পরস্পরের ঘোর বিরোধী শত্রু হওয়া সত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে কিছু অনন্য নিয়ম অনুসরণ করতেন। ইউরোপের মধ্যযুগের নাইট বা বীর যোদ্ধাদের অনুসৃত ‘শিভালরি’ আচরণ বিধি অনুসরণ করতেন রিচার্ড। সালাহুদ্দিন তৎকালীন ইসলামী যুদ্ধনীতি ও আরবের ঐতিহ্যবাহী শিষ্টাচার, পারস্পরিক সম্মান ইত্যাদি বজায় রাখার নিয়ম অনুসরণ করতেন। অসুস্থ শত্রুর প্রতি সহানুভূতি ও চিকিৎসা সহায়তা, সমকক্ষতার নীতি (রাজা বনাম রাজা), সালাউদ্দিন বিশ্বাস করতেন এক রাজা অন্য রাজাকে হত্যা বা অতর্কিত আক্রমণ করবে না। দূত ও উপহার বিনিময়, বেসামরিক ও তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা, যুদ্ধবন্দী বিনিময় ও মুক্তিপণ নীতি ইত্যাদি কঠোরভাবে মেনে চলতেন উভয় রাজা।
সুলতান সালাহুদ্দিন কেবল যুদ্ধের ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারেও বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি কাইরো, দামেস্ক, জেরুজালেম সহ সম্রাজ্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শহরে অসংখ্য মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই মিশরের বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় কে শুধুমাত্র শিয়া মতাবলম্বীদের থেকে সুন্নি সহ সর্বসাধারণের উচ্চ শিক্ষার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত ‘সালাহুদ্দীনের দুর্গ’ মিশরের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে এখনো টিকে আছে।
তৃতীয় ক্রুসেড শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস পর এই মহান বীর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ মার্চ দামেস্কে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইতিহাসের অন্যতম পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের মালিক হয়েও তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে ও আড়ম্বরহীন। মৃত্যুকালে সালাহুদ্দিনের ব্যক্তিগত তহবিলে মাত্র ১টি স্বর্ণ মুদ্রা ও ৪৭টি রৌপ্যমুদ্রা ছাড়া কোনো সম্পদ বা টাকাকড়ি ছিল না। দানশীল সালাউদ্দিন তাঁর সমস্ত ধন-সম্পদ দরিদ্র ও জনকল্যাণমূলক কাজে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর কাফন ও দাফনের খরচ মেটানোর জন্য তাঁর বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছিল।
দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের পাশেই জেরুজালেম বা আল-কুদস বিজয় দানকারী রাজা, বাইতুল মুকাদ্দাস বা আল-আকসা মসজিদ মুক্তকারী সুলতান, পবিত্র দুই মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক এবং মিশর ও সিরিয়ার সুলতান এই মহান বীরের মাজার অবস্থিত।
সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কেবল একজন অপরাজেয় সামরিক কমান্ডারই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ভালো প্রশাসক। ধর্মীয় সহনশীলতা, ন্যায় বিচার এবং মানবতার মূর্ত প্রতীক। যুদ্ধক্ষেত্রের চরম মুহূর্তেও তিনি ইসলামের মানবিক আদর্শ ও নৈতিকতা বিসর্জন দেননি। এই কারণেই সালাহুদ্দিন আইয়ুবি মুসলিমদের কাছে যেমন এক শ্রদ্ধেয় বীর, ঠিক তেমনি পশ্চিমা বিশ্বেও এক পরম সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতাকামী ও অধিকারহারা মানুষের জন্য তিনি এক অন্তহীন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।
তথ্যসূত্র : ইবনে কাসির
বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাত
লেখক পরিচিতি:Gulshanul Haque Shumon একজন ইতিহাস ঐতিহ্য সংগ্রাহক ও সুলেখক।তাছাড়া তিনি প্রাচীন বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত আর্টিকেল লিখে আসছেন।এই লেখাটি তার ভেরিফায়েড পেজবুক পোস্ট থেকে সংগৃহিত।
ছবি:
প্রতীকি।
