বেশ্যালয়ের মাটিই দেবী দুর্গা প্রতীমা গড়ার মূল ভিত্তি!
06 Oct 2026 • সারাদেশ

স্টাফ রিপোর্টার|জনতার দেশঃ
দুর্গা পূজায় প্রতিমা গড়তে বেশ্যালয়ের মাটি কেন লাগে?
দুর্গাপূজার সূচনা ঘটে দেবী দুর্গার মৃণ্ময়ী মূর্তি গড়ার মধ্য দিয়ে। এই মৃণ্ময়ী প্রতিমাকে চিন্ময়ী দেবীরূপে আবাহন করার প্রক্রিয়াটি কেবল কিছু উপাচারের সমাহার নয়, বরং এর নেপথ্যে রয়েছে শাক্ত শাস্ত্র, তন্ত্র ও পৌরাণিক ভাবধারার এক গভীর গূঢ়তত্ত্ব।
প্রাচীন সনাতন শাস্ত্রের বিধানানুযায়ী, দেবী প্রতিমা নির্মাণে মূলত চারটি প্রধান উপাদান অপরিহার্য: গঙ্গা বা নদীর পলিমাটি, গোমূত্র, গোময় (গোবর) এবং নিষিদ্ধ পল্লী বা গণিকালয়ের দুয়ারের মাটি (যা শাস্ত্রে ‘পুণ্য মৃত্তিকা’ নামে অভিহিত)।
সামাজিক সংস্কারের চোখে যা আপাতদৃষ্টিতে contradictory বা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, শাস্ত্রীয় ও তান্ত্রিক দর্শনে তা পরম পবিত্র ও সামাজিক সমতার এক অনন্য বার্তা বহন করে।
আজ আমি এই শাস্ত্রীয় আচারটির গভীর তত্ত্বীয় ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা শ্লোক ও প্রমাণসহ বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করবো।।
🌿🌿 “নবকন্যা’ পূজা ও শাক্ত পরম্পরাঃ
শাক্ত দর্শনে দেবী দুর্গা হলেন বিশ্বজনীন নারীশক্তির আধার। দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান ও অবশ্যপালনীয় অঙ্গ হলো ‘নবকন্যা’ পূজা বা নয়টি ভিন্ন সামাজিক স্তরের নারীর প্রতীকী বন্দনা।
শাস্ত্রীয় প্রথানুসারে যে নয় শ্রেণীর নারীর পূজা না করলে মহামায়ার আরাধনা অসম্পূর্ণ থাকে, তাঁরা হলেন—
(“নর্তকী কাপালিকী বেশ্যা রজকী নাপিতাঙ্গনা।
ব্রাহ্মণী শূদ্রকন্যা চ তথা গোপালকন্যকা।
মালাকারস্য কন্যা চ নবকন্যাঃ প্রকীর্তিতাঃ।।”)
অর্থ: নর্তকী, কাপালিক নারী, গণিকা বা বেশ্যা, ধোপানী, নাপিতের স্ত্রী/কন্যা, ব্রাহ্মণী, শূদ্রা, গোয়ালিনী এবং মালীর কন্যা—এই নয় জন ‘নবকন্যা’ নামে অভিহিত।
এই বিধান প্রমাণ করে যে, দেবী পূজায় সমাজের কোনো স্তরের নারীই অপবিত্র বা ত্যাজ্য নন। সমাজের তথাকথিত প্রান্তিক ও অবহেলিত নারীদের সম্মান ও অধিকারকে স্বীকৃতি দিতেই গণিকালয়ের মৃত্তিকাকে মণ্ডপে দেবীর পাদপীঠে স্থান দেওয়া হয়।
🌿🌿 তন্ত্রশাস্ত্রের পারিভাষিক ব্যাখ্যা ও ‘অভিষিক্তা’ তত্ত্ব
তন্ত্রাভিধান এবং প্রাচীন শাক্ত গ্রন্থগুলোতে ‘বেশ্যা’ শব্দটির প্রয়োগ কেবল সাধারণ লৌকিক অর্থে হয়নি, এর রয়েছে এক গভীর তান্ত্রিক পারিমণ্ডলিক ব্যাখ্যা।
‘মাতৃকা-নির্ঘণ্ট’ এবং কুলার্ণব তন্ত্রের মতো তান্ত্রিক গ্রন্থগুলোতে যিনি কাম-বাসনা জয় করে উচ্চতর সাধনায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, অথবা যিনি মহাসাধিকা, তাঁকেও প্রতীকী অর্থে ‘অভিষিক্তা’ বা ‘বেশ্যা’ বলা হয়েছে।
(“বিশেষেণ রাতি দাতীতি বেশ্যা।”)
অর্থাৎ, যিনি সাধনা ও ভক্তির মাধ্যমে ভক্তকে বিশেষ আনন্দ বা পরমার্থ দান করেন, তিনিই ‘বেশ্যা’ (তান্ত্রিক পরিভাষায় সিদ্ধসাধিকা)।
অতীতকালে শাক্ত সাধনপীঠে সাধিকাগণ তান্ত্রিক আচার অনুশীলন করতেন। কালক্রমে সেই সকল তান্ত্রিক সাধনপীঠ বা আঙিনার পবিত্র মৃত্তিকাই দেবী প্রতিমার অঙ্গে যুক্ত করার নিয়ম হিসেবে লোকপরম্পরায় প্রচলিত হয়েছে।
🌿🌿পৌরাণিক আখ্যানঃ
শিবের বর ও করুণার প্রচ্ছায়া
পৌরাণিক কাহিনীতে এই আচারের পেছনে মহাদেব শিবের কৃপা ও করুণার একটি মনোহর গল্প পাওয়া যায়।
একদা একদল যৌনকর্মী গঙ্গা স্নানে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে এক ব্যাধিগ্রস্ত, কুষ্ঠরোগাক্রান্ত বৃদ্ধকে দেখতে পান। সমাজের অন্য মানুষজন যখন ঘৃণা ও ভয়ে তাঁকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল, তখন এই নারীরা কোনো সংকোচ না করে অত্যন্ত সশ্রদ্ধ চিত্তে সেই অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করেন এবং পরম মমতায় তাঁকে গঙ্গাস্নানে সাহায্য করেন।
প্রকৃতপক্ষে সেই বৃদ্ধ ছিলেন ছদ্মবেশী স্বয়ং দেবাধিদেব মহাদেব। তাঁদের এই অহংকারহীন নিঃস্বার্থ সেবা, করুণা ও অন্তরের ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে শিব নিজ রূপ ধারণ করেন এবং আশীর্বাদ প্রদান করেন:
( “হে কল্যাণীগণ, তোমাদের এই মানবীয় করুণা ও সেবার গুণে তোমরা ধন্য। ভবিষ্যতে মহাদেবীর (দুর্গা) মৃণ্ময়ী প্রতিমা গঠন তোমাদের দ্বারের মৃত্তিকা ব্যতীত সম্পূর্ণ হবে না। জগতের মানুষ তোমাদের দ্বারে এসে নতশিরে মাটি প্রার্থনা করবে।”)
সেই পৌরাণিক বরদান অনুসারেই যুগে যুগে প্রতিমা নির্মাণে গণিকালয়ের মাটি আবশ্যিক হয়ে আসছে।
🌿🌿‘পুণ্য মাটি’ ও মানবীয় নৈতিকতার দর্শনঃ
সনাতন দর্শনে এই আচারের পেছনে এক সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
বিশ্বাস করা হয়, যখন কোনো পুরুষ ভোগ ও লালসার বশবর্তী হয়ে নিষিদ্ধ পল্লীর চৌকাঠ অতিক্রম করে, তখন সে তার জীবনের অর্জিত যাবতীয় সৎচিন্তা, নৈতিকতা, পুণ্য ও নম্রতা সেই প্রবেশদ্বারের বাইরে বিসর্জন দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য মানুষের ফেলে যাওয়া সেই পবিত্র নৈতিকতা ও পুণ্য দরজার মুখে সঞ্চিত হতে থাকে।
ফলে রূপক অর্থে গণিকালয়ের প্রবেশদ্বারটি হয়ে ওঠে মানুষের বিসর্জিত সততা ও পুণ্যের আধার—যা শাস্ত্রে ‘পুণ্য মাটি’ নামে পরিচিত। মহামায়ার প্রতিমায় এই মাটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো, সমাজ থেকে বিসর্জিত সেই শুভভাব ও পুণ্যকে পুনরায় বিশ্বমায়ের কাছে সমর্পণ করা।
🌿🌿মৃৎসংগ্রহের আনুষ্ঠানিক নিয়ম ও বিনম্রতার শিক্ষাঃ
এই মৃত্তিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত নিয়মবদ্ধ এবং আধ্যাত্মিক বিনম্রতার শিক্ষা দেয়।
শাস্ত্রীয় প্রথা অনুযায়ী, প্রতিমা শিল্পী বা পূজার প্রধান পুরোহিতকে নিজে গিয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে যৌনকর্মীর দরজায় দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে এই মাটি ‘ভিক্ষা’ চাইতে হয়। যতক্ষণ না তিনি স্বইচ্ছায় ও সানন্দ চিত্তে এই মাটি দান করছেন, ততক্ষণ পুরোহিতকে অপেক্ষা করতে হয়। মাটি গ্রহণের সময় বৈদিক বা তান্ত্রিক মন্ত্র উচ্চারণ করা হয়ঃ
(ওঁ সর্বদেবীময়ী দেবী সর্বাধারা সনাতনী।
মৃত্তিকে হরে মে পাপং যন্ময়া পূর্বসঞ্চিতম্।।)
(অর্থ: হে সর্বদেবীময়ী, সর্বাধারা সনাতনী মৃত্তিকা, আমার পূর্বসঞ্চিত সমস্ত পাপ ও অহংকার হরণ করো।)
এই আচারটি উচ্চবর্ণ বা সমাজের তথাকথিত উচ্চবিত্তদের অহংকার চূর্ণ করে। যে সমাজ সারা বছর এই নারীদের ঘৃণা বা অবহেলা করে, দেবী পূজার পূর্বে সেই সমাজের প্রতিনিধিকেই তাঁদের দ্বারে নতশিরে দণ্ডায়মান হতে হয়। এটি যেমন সর্বজনীন সমতার শিক্ষা দেয়, তেমনই প্রকাশ করে যে দেবীর দরবারে কেউ অস্পৃশ্য নয়—তিনি বিশ্বজননী, সর্বভূতে বিরাজিতা।
সূত্র:
# সনাতন শাস্ত্রীয় বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্হাদি।
