রাজনীতির পালা বদলে শেখ মুজিব এর রাজনৈতিক সচিব আজকের তোফায়েল আহমেদএবং রক্ষীবাহিনীর নির্দয় ইতিহাস।
13 May 2026 • রাজনীতি

আজিম রহমান:
গেস্টাপো বাহিনীর বৃদ্ধ জেনারেলদের মতই দেখায় তোফায়েল আহমদের আজকের চেহারা।
জীবন সায়াহ্নে এসে ভোলার তোফায়েল সাহেব কি নিজের ঝাঁপিত জীবনের দিকে একবার চোখ ফিরে তাকাবেন? বয়সের ভারে নুয্য হয়ে বিছানায় শায়িত তিনি, চাইলেও হয়ত হাসপাতালের জানালা দিয়ে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে দেখার শক্তি পাবেন না। অবশ্য কেউ যদি হুইল চেয়ারে বসিয়ে হাসপাতালের নির্জন কক্ষের জানালার পাশে বসিয়ে দেন হয়ত ক্যালেইডোস্কোপের মত নিজের জীবনকে বাংলাদেশের জীবন হিসাবে দেখতে সক্ষম হবেন। তার জন্যে প্রয়োজন হবে অনেক উঁচু তলার একটা কক্ষ। কারণ নিচু তলার কোলাহলকে তিনি হয়ত গুলিয়ে ফেলবেন দলীয় স্তাবকদের দানবীয় উল্লাসের সাথে। ভাববেন হয়ত ফিরে এসেছেন তিনি। ফিরে এসেছে ক্ষমতা। ধরে নেবেন ঢাকার ময়লা গিঞ্জি হাসপাতাল হতে এয়ার এম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় হয়েছে হয়তো।
তোফায়েল আহমেদকে আমার জীবনের একটা অংশে প্রায় প্রতিদিন দেখতাম। শেখ মুজিবের পাশে বসে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যাচ্ছেন। সাথে শেখ মুজিবের বড়িগার্ড মুন্সিগঞ্জের মহিউদ্দিন। তখন ঐ রাস্তা দিয়ে রিক্সা চলাচলের প্রচলন ছিল। আমি শান্তিনগর হতে রিক্সা চড়ে ঢাকা কলেজ যাচ্ছি, একই রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে সশস্ত্র পুলিশ পাহারায় বাংলাদেশের রাজাধিরাজরা পার হচ্ছেন। শেখ মুজিব হাতে পাইপ নিয়ে ধূমপান করছেন, পাশে তোফায়েল আহমেদ গায়ে বঙ্গবন্ধু কোট ও তার উপর লম্বা সাদা একটা গলাবন্ধ ঝুলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ঢাকার রাজপথ চিড়ে।
তোফায়েল আহমেদের শুরু সেই ১৯৭১এর রক্তমাখা দিনগুলোতে। তিনি তখন কোলকাতায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হওয়ার অবস্থা তখনই নিজেদের পরীক্ষিত মিত্র এই লীগকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং ‘র’। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান’এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় মুজিব বাহিনী নামের একটি রাজনৈতিক সশস্ত্র বাহিনী। বাংলাদেশের পক্ষে এই বাহিনীর সংগঠক হিসাবে কাজ করেন সেরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক এবং অবশ্যই আমাদের তোফায়েল আহমেদ। এই বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগের যুদ্ধ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা। আমরা রণাঙ্গনের কয়েক শত মাইল দূরে বসে গুজব শুনতাম মুজিব বাহিনীর সাথে যুদ্ধরত বাকি মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ের গল্প।
শেখ মুজিব দেশে ফিরে দেশ শাসনের সব যোগ্যতা হারিয়ে যখন দিশেহারা তখন তার সাহায্যে এগিয়ে আসে পুরানো বন্ধু ‘র’। সুশাসক হিসাবে দেশকে দেয়ার কিছু অবশিষ্ট না থাকায় শেখ মুজিব নিজকে স্বৈরশাসকের খাতায় নাম লেখাতে বাধ্য হন ‘র’এর প্রত্যক্ষ মদদে। ফ্রন্টের মুজিব বাহিনীর ১০ হাজার সদস্যের সাথে যোগ দেয় টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর কিছু সেনা, ওদের নিয়ে গঠিত হয় স্বৈরশাসনের অন্যতম হাতিয়ার জাতীয় রক্ষীবাহিনী। পরবর্তীতে এই বাহিনীকে দেশে বিদেশে অনেকে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর সাথে তুলনা করেছিলেন।
সদ্য কৈশোরে পা দেয়া এই আমি তখন বাংলাদেশের এক থানা শহরে থাকি। রাত নামলেই শহরের অলিগলিতে নেমে আসতো ভৌতিক নীরবতা। রক্ষীবাহিনীর ট্রাক ও বুটের আওয়াজের ভয়ে কম্পমান থাকতো গোটা শহর। বিশেষকরে যারা রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলনা তাদের পরিবার।
প্রতিবেশী দেশের চারু মজুমদারের নাম প্রায়ই উঠে আসতো খবরের পাতায়। ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক নিজকে সামনে আনেন নক্সালবাড়ি কৃষক আন্দোলনের মাধ্যমে। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের তরুণ সমাজও প্রভাবিত হয় চারু মজুমদারের আদর্শে। এই সুযোগটাই নেয় শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী। বিশেষকরে দক্ষিণ বাংলার শহর বন্দর হতে শত শত তরুণদের অপহরণ করে নিজেদের আওতায় নিয়ে আসে রক্ষীবাহিনী। এবং বন্দীদশায় শুরু করে টর্চার ও গুপ্ত হত্যা। বলা হয় সে সময় ৩০ হাজার ছাত্র জনতাকে খুন করেছিল শেখ মুজিবের রক্ষীবাহিনী। অনেকে অস্বীকার করলেও এই বাহিনীরই মাষ্টার মাইন্ড ছিলেন আজকের আপাতদৃষ্টিতে অসুস্থ ও অসহায় তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছিলেন শেখ মুজিবের ডানহাত। অফিসিয়াল ডেজিগনেশন ছিল রাজনৈতিক সচিব।
ইতিহাস কি বলে এ নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই। কারণ সে ইতিহাসের আমিও সাক্ষী। তোফায়েল আহমদের শক্তি ও প্রতিপত্তির কাছে আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাই ছিল পরাজিত। রক্ষীবাহিনী হাতে কেউ গুম হলে প্রথমেই আসতো তোফায়েলের নাম। আপনজনের সন্ধানে অনেকেই নিজদের যাত্রা শুরু করতো তোফায়েলের দুয়ারে ধর্না দিয়ে।
আজকের বৃদ্ধ, অসহায় লুকিং তোফায়েল আহমেদ কিন্তু সবসময় এমন বৃদ্ধ অথবা অসহায় ছিলেন না। ৩০ হাজার স্বদেশীর রক্তের দাগ এই গেস্টাপো প্রধানের হাতে। নিজ প্রভুকে সন্তুষ্ট করার জন্যে হেন কোন অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। ৬ দফা ১১ দফা অথবা ৭১’এর ইতিহাস দিয়ে যতই মহিমান্বিত করার চেষ্টা করুন না কেন দিন শেষে তিনি এখন খুনি। হিটলারের জেনারেলরা আর্জেন্টিনার জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে গিয়ে যেভাবে বৃদ্ধ হয়েছিলেন তোফায়েলের সমসাময়িক চেহারা তাদের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা। তোফায়েল আহমেদও এ বাস্তবতা হতে পালাতে পারবেন না।
তথ্য:
সংগৃহীত।
তথ ঋণ: আজিম রহমান।যিনি একাত্তরের রণাঙ্গনের একজন বীর মুক্তি যোদ্ধা।যিনি তোফায়েল আহমেদ এর রাজনৈতিক জীবন এবং অসীম ক্ষমতা নিজ চোখে দেখেছেন।
