রাষ্ট্র পতি নির্বাচনে কোন সংসদ সদস্য ভোট না দিলে কি পদ হারাবেন তারা? সংবিধান কী বলে?
18 Aug 2026 • সারাদেশ

মো: মাহবুবুর রহমান খান
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোন সংসদ সদস্য অসুস্থ্য থাকলে বিদেশে অবস্থান কিংবা অন্য কোন কারণে ভোট দিতে না পারলে তার হয়ে অন্য কোন সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না।
একইভাবে সদস্যের অনুপস্থিতির কারণে তার ভোট অন্য কারো মাধ্যমে দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ভোট না দিলে তার ভোটটি গণনায় আসবেনা।
তবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ দলীয় প্রার্থীকে ভোট না দিলে কি হবে? এ বিষয়ে স্পষ্ট করে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন এক্ষেত্রে ওই সংসদ সদস্যের সদস্য পদ বাতিল হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ১ দফায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যগণের দ্বারা নির্বাচিত হইবেন। অর্থাৎ জনগণের সরাসরি ভোটে নয়। সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রণীত নির্বাচন আইন ১৯৯১ এর (১০) ধারায় ভোট গ্রহনের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হবেন। ২ উপধারায় বলা হয়েছে এই আইনের অধীনে কোন নির্বাচনে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটিমাত্র ভোট থাকবে।
আইনের ১০(৩) ও ১০(৪) উপধারায় ভোট দেওয়ার পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রত্যেক সংসদ সদস্য তার জন্য নির্দিষ্ট ব্যালট সংগ্রহ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নামের বিপরীতে নিজের পূর্ণ নাম সাক্ষর করে ভোট দেবেন। অর্থাৎ ভোটটি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ভোট। ফলে কোন সংসদ সদস্য ভোটের দিন অসুস্থতার কারণে উপস্থিত না হতে পারলে তার ভোট অন্য কোন সংসদ সদস্য দিতে পারবেন না। একইভাবে সংসদ সদস্য বিদেশে অবস্থান করলে অনলাইন বা অন্য কোন সংসদ সদস এর মাধ্যমে তার ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ১৯৯১ এর ১০ ধারায় নেই।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিঃ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনকর্তা হিসেবে এই নির্বাচন পরিচালনা করবেন।এজন্য জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে যেখানে নির্বাচনকর্তা সভাপতিত্ব
করবেন। সংসদের অধিবেশন চলাকালীন নির্বাচনের প্রয়োজন হলে কমিশন ভোট গ্রহণের অন্ততঃ ৭ দিন আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের সময় সুচি নির্ধারণ করবে।
আর সংসদ অধিবেশন স্পিকারের ৭ দিন আগে আলোচনা করে বৈঠক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আহ্বান করবে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর থাকতে হবে। এছাড়া যিনি মনোনীত হবেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে তার সম্মতি সূচক একটি বিবৃতি থাকতে হবে। এই নির্বাচনে ভোটার হবেন সংসদ সদস্যরা। কমিশন একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে।
বৈধ একাধিক প্রার্থী থাকলে এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন শেষে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদের বৈঠকে নির্ধারিত দিনে দুপুর ১২ টার পর ব্যালট পেপারে এ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গ্রহণ যেমন প্রকাশ্যে হবে তেমনি ভোট গণনাও প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে।সর্বোচ্চ ভোট যদি একাধিক প্রার্থী পেয়ে যান তবে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণ করবেন সিইসি। ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণা চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার কারা?
সংসদ সদস্যদের ভোটের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। তারা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বর্তমানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। আইন অনুযায়ী তাদের নাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় তোলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা, একজন নির্বাচিত প্রার্থীর বিরূদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ থাকায় চট্টগ্রাম ৪ আসনে কোন ভোটার নেই ।
সংসদের সাধারণ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ২০৯ জন জোটগত আসন ২১২ জামায়াতের জোটগত আসন(জামাত এনসিপি)৭৭ অন্যান্য দলের ৭ জন ও স্বতন্ত্র ৭ জন ভোটার রয়েছেন। আর সংরক্ষিত আসনে বিএনপি ও সমমনাদের ৩৬ জন, জামাত জোটের ১৩জন ও স্বতন্ত্র ১ জন রয়েছেন।তারা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার।
ভোটদানে বিরত থাকলে কি হবে?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোন সংসদ সদস্য যথাযথ কারণ ছাড়া ভোটদান থেকে বিরত থাকলে তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ১৯৯১ এ কোন সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নেই। আইনের ১০ ধারায় প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোটের কথা বলা হলেও ভোট না দেওয়ার জন্য জরিমানা, সদস্যপদ বাতিল বা অন্য কোন শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি।
তবে সরকারদলীয় চীফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন কেউ উপস্থিত থেকে ভোট না দিলে ধরে নেওয়া হবে সেটি দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। দলীয় প্রার্থীকে ভোট দিতে বলা হয়েছে তাই ভোট দেওয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, কেউ সুস্থ অবস্থায় থেকে ভোট না দিলে তার সদস্য পথ চলে যাওয়ার শামিল। আর দলের বিপক্ষে অন্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিলে অবশ্যই তার সদস্য পদ চলে যাবে।
কেউ ভোট দিতে পারা অবস্থায় না থাকলে কিংবা বিদেশে থাকলে কি হবে জানতে চাইলে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গণমাধ্যমকে জানান, কেউ ভোট দিতে না পারলে দেশের বাইরে থাকলে বা অসুস্থ থাকলে তিনি ছুটি নেবেন।
কতজন এমপি ভোট দিলে নির্বাচন হবে?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোন সংসদ সদস্য অনুপস্থিত থাকলে তার ভোট গণনায় না এলেও এ কারণে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাবে এমন আইনের কথা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের ১০ ধারায় কোথাও নেই। আইনে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোটের কথা বলা হয়েছে এবং ভোট দেওয়ার ব্যক্তিগত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংসদে সদস্যের মধ্যে ২০ জন অসুস্থ্য থাকার কারণে ভোট দিতে পারলেন না, তাহলে বাকি ৩৩০ জন সদস্য ভোট দিতে পারবেন। অনুপস্থিত ২০ জনের ভোট অন্য কোন সদস্যের ভোটের সঙ্গে যোগ হবে না।
একাধিক প্রার্থী থাকলে নির্বাচন আইন ১৯৯১ এর ৯ ধারায় ভোট গ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনের সংসদ সদস্যদের শুরুতে নির্বাচন কমিশনার প্রার্থীদের এবং তাদের প্রস্তাবক ও সমর্থকদের নাম ঘোষণা করার কথা বলা হয়েছে। এরপর ১০ ধারায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করা হয়।
প্রকাশ্য ভোট, তবে ব্যালটেঃ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী প্রকাশ্য ভোট দেওয়ার জন্য ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়, ব্যালটে নির্দিষ্ট অংশে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করতে হয় এবং যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন তার নামের বিপরীতেও নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দিতে হয়।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যের ভোট অন্য কেউ দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে অসুস্থতা বিদেশে অবস্থান বা অন্য কোন কারণে ভোট দিতে না পারলে তার ভোটটি বাদ দিয়েই উপস্থিত সদস্যদের ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলঃ
গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ইসি। সাংবিধানিক সংস্থাটি জানায়,নির্বাচনকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি এএম এম নাসির উদ্দিন। তারপর থেকে শুরু হয় নির্বাচনের কার্যক্রম।
তফসিল অনুযায়ী ১৩ আগস্ট সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচনকর্তার কার্যালয় মনোনয়নপত্র দাখিল করেন প্রার্থীরা। ১৬ আগস্ট সকাল ১০ টা থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি এএম এম নাসির উদ্দিন।
যাচাই-বাছাই শেষে বিএনপি’র প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। একই দিনে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও লিভারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহাম্মদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।
তফসিল অনুযায়ী ১৮ আগস্ট বিকাল ৪ টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। আর আগস্ট দুপুর ২ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রবিবার১৬ আগস্ট ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৬ এর মনোনয়নপত্র পরীক্ষার দিন ছিল আজ। অলি আহমেদের দুটি মনোনয়নপত্র এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি মনোনয়নপত্র পাওয়া গেছে।
অলি আহমেদের মনোনয়নপত্র সকালে যাচাই বাছাই করে যথার্থতা পাওয়া গেছে এবং সেটি গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন পত্র পাওয়া গেছে। ফলে দুটি মনোনয়নপত্রই
বৈধ। তিনি আরো বলেন,১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। আগামী ২০ আগস্ট দুপুর ২ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তথ্য সূত্র:
* দৈনিক প্রথম আলো।
* দৈনিক ইত্তেফাক।
* দৈনিক যুগান্তর।
* বাংলা ট্রিবিউন।
* বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন।
* বিডিনিউজ২৪.কম।
* ভয়েস বাংলা।
বি.দ্র.
প্রতিবেদক,মো: মাহবুবুর রহমান খান
সম্পাদক-প্রকাশক,দৈনিক জনতার দেশ (অনলাইন পোর্টাল)
