৩০ তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক ” চেইন অব কমাণ্ড” ভেঙ্গে পড়ার আশংকা।
17 Aug 2026 • জাতীয় সংবাদ

মো: মাহবুবুর রহমান খান :
৩০ তম বিসিএস ব্যাচের পরিচিতি :৩০ তম বিসিএস ব্যাচের নিয়োগ ও গেজেট প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পন্ন।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মেয়াদে (২০০৯-২০১৩)এই ব্যাচের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে রিক্রুটমেন্ট বা নিয়োগের মূল গেজেট জারি করা হয়।
৩০ তম বিসিএস এর পুলিশ প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান পরিস্থিতি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে।
যেখানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা তুলনামূলকভাবে সময়মত পদোন্নতি পেয়ে সুবিধা জনক অবস্থানে আছেন সেখানে পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জট ও সাম্প্রতিক পদায়ন প্রস্তাব নিয়ে বড় ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
নিচে দুই ক্যাডারের বর্তমান পরিস্থিতির এক তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো :
*পুলিশ ক্যাডার ৩০ তম বিসিএস*
পদোন্নতি জট ও হতাশাঃ এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের চাকরি কাল ১৫ বছর হতে চললেও একটি বড় অংশ এখনো অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) বা ডিএমপিতে অতিরিক্ত উপ- পুলিশ কমিশনার ( এডিসি) হিসেবেই রয়ে গেছেন । অতীতে যেখানে ৭/৮ বছরের মধ্যে পুলিশ সুপার (এসপি) পদোন্নতি হতো সেখানে দীর্ঘ সময় পূর্ণাঙ্গ এসপি হতে না পারায় এই ব্যাচের তীব্র পেশাগত ক্ষোভ রয়েছে।
সাম্প্রতিক পদায়ন বিতর্ক ও শঙ্কাঃ
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩০ তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদে পদায়নের একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। তবে ২৮ ও ২৯ তম বিসিএস ব্যাচের প্রায় ৯২ জন কর্মকর্তা এখনো নিয়মিত পদায়ন না পাওয়ায় অপেক্ষাকৃত জুনিয়র ৩০ তম ব্যাচকে আগে পদায়ন করার এই উদ্যোগ চেইন অব কমান্ড ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের বড় শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
চাকরিগত বৈষম্য*
৩০ তম ব্যাচ পুলিশ বনাম প্রশাসন ক্যাডারের মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান।বর্তমান পদমর্যাদায় পুলিশে পদোন্নতি পেয়ে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আর প্রশাসনিক ক্যাডারে উপসচিব বা ডেপুটি সেক্রেটারি। যেখানে ধীরগতি ও তীব্র জট, অগ্রজ ব্যাচের কারণে পদোন্নতি আটকে আছে সেখানে প্রশাসন ক্যাডার তুলনামূলকভাবে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে একজন ডেপুটি সেক্রেটারি।
বর্তমান সংকটে ৩০ তম ব্যাচ পুলিশ :
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদায়নের প্রস্তাব নিয়ে বাহিনীর ভেতর বিতর্ক।
প্রশাসন ক্যাডার ঃ
কোটা সংস্কার প্রস্তাব ক্ষোভ ও মাঠ পর্যায়ে চাপ।
ইদানিং দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩০ তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচকে ঘিরে মূল শঙ্কা ও বিতর্কটি তৈরি হয়েছে পুলিশের চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো একটি নতুন পদোন্নতি প্রস্তাবের ইস্যু কে কেন্দ্র করে এই শংকা সৃষ্টি।
*শঙ্কা ও বিতর্কের মূল কারণসমূহ*
জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনঃ পুলিশ সদর দপ্তরে সম্প্রতি ৩০ তম বিসিএস এর কর্মকর্তাদের নিয়মিত পদায়নের জন্য একটি প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে এর আগে জ্যেষ্ঠ ব্যাচ যেমন ২৮ এবং ২৯ তম বিসিএস এর প্রায় ৯২ জন কর্মকর্তা এখনো পদোন্নতি ও নিয়মিত পদায়ন থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
চেইন অব কমান্ড ভাঙ্গার ভয়ঃ
জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দাবি,দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা ও জটিলতা দূর না করে জুনিয়র বা কনিষ্ঠ ব্যাচ কে (৩০ তম ব্যাচ) নিয়মিত পদায়ন করা হলে বাহিনীতে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ ও জটিলতা তৈরি হবে।যার ফলে পুলিশের ঐতিহ্যবাহী কাঠামোগত শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে।
সুপার নিউ মারারি পদ নিয়ে জটিলতাঃ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, পুলিশের বর্তমান শূন্য পদগুলোতে আগে ২৮/২৯ তম ব্যাচের সুপার নিউ মারারি সংখ্যাতিরিক্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে পদায়ন করতে হবে। তাদের সঠিক মূল্যায়ন না করে ৩০ তম ব্যাচকে প্রাধান্য দিলে প্রশাসনিক জটিলতা তীব্র ও ভয়ংকর রূপ নেবে।
৩০ তম ব্যাচের নিজস্ব বঞ্চনার চিত্রঃ
এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিজস্ব ক্ষোভের মধ্যে রয়েছে তাদের চাকুরীর মেয়াদ ১৫ বছর হতে চললেও একটি বড় অংশ এখনো অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এডিশনাল এসপি হিসেবে কর্মরত আছেন। অতীতে যেখানে ৭/৮ বছরের মধ্যে পদোন্নতি হয়ে পুলিশ সুপার ( এসপি) হতো সেখানে দীর্ঘ সময় পদোন্নতির না পাওয়া এই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের পেশাগত হতাশা ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
বিপরীত চিত্র : (পদোন্নতি বঞ্চিত ২৮/২৯ ব্যাচ নিয়ে ভিন্ন জনের ভিন্ন মতামত)
৩০ তম ব্যাচের হতাশা আর ক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টা প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ২৮ ২৯ ব্যাচের পদোন্নতি বঞ্চিত ৫/৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা এসপি,(সুপারনিউমারারি) এর সংগে কথা হলে, তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক জনতার দেশ (অনলাইন পোর্টাল) কে জানান,পদোন্নতি বঞ্চিত ২৮ / ২৯ ব্যাচের
৯২জন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে রেখে জুনিয়র ৩০ ব্যাচকে পদোন্নতি দিলে বাহিনীর মধ্যে অনেক বৈরিতার সৃষ্টি হবে, পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবার পাশাপাশি নিজস্ব চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়বে।
তবে এ বিষয়টি নিয়ে অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রচিন্তকগণ ভিন্ন ভিন্ম মত পোষণ করছেন।
তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ৩০ তম ব্যাচ আওয়ামী লীগ সরকারের রিক্রুটমেন্ট হোল্ডার। তাদেরকে দায়িত্বশীল পদে বসালে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র এবং সরকারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের জন্য অশনি সংকেত ও বটে। যেহেতু তারা আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে রিক্রুটমেন্ট তাই তাদের চিন্তা চেতনা ও ধ্যান ধারণা ফ্যাসিস্ট সরকার কে ঘিরেই আবর্তিত হবে।
তারা তাদের কমান্ড মানতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবে, যাদের সুপারিশে তারা পুলিশ ক্যাডারে চাকরি পেয়েছিলেন। তারা বর্তমান সরকারের জন্য ভবিষ্যৎ হুমকি ও নিরাপত্তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, ২৮ / ২৯ ব্যাচের ৯২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি না দিয়ে অপেক্ষা কৃত জুনিয়র ব্যাচ কে পদোন্নতি দিলে পুলিশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হবে যা সমগ্র বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
ধীরে ধীরে দায়িত্বশীল পুলিশ বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে গিয়ে পুলিশ একটি (political domestic) বাহিনীতে পরিণত হবে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা আরো বৃদ্ধি পাবে, তখন সেই পরিস্থিতি সরকারকে সামাল দিতে অনেক হিমসিম খেতে হবে।
দেশের জনসাধারণ অতিষ্ট হয়ে এক সময় সরকার পতনের জন্য রাজপথে আন্দোলনে নেমে পড়বে। তাই বর্তমান সরকারকে ভেবেচিন্তে সামনে অগ্রসর হতে হবে।
এখন কোন পথে হাঁটলে দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে সেই সিদ্ধান্ত একান্তই সরকারের এখতিয়ার।
তথ্য ঋণ:
# দৈনিক যুগান্তর।
#পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রেরিত নথিপত্র।
#দৈনিক ইত্তেফাক।
#বিডিনিউজ ২৪ ডট. কম।
#বাংলাভিশন (স্যাটেলাইট চ্যানেল)।
#যমুনা টিভি (স্যাটেলাইট চ্যানেল)।
#Dhaka Tribune.
#দৈনিক নয়া দিগন্ত।
# দৈনিক আমার দেশ।
বি.দ্র.
প্রতিবেদক মোঃ মাহবুবুর রহমান খান,
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক জনতার দেশ (অনলাইন পোর্টাল)।
