মোঃ সায়মন হোসেন:
🖋️ ইতিহাসের ধুলোবালি ঝেড়ে ডার্ক ও রোমহর্ষক সত্য উন্মোচনের নিয়মিত আয়োজনে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছে ‘ইতিহাসের ঝরোকা’। আজ আমরা ফিরে যাব ১৮ ও ১৯ শতকের শুরুতে, যখন ঢাকার চারপাশের জলপথ আর জঙ্গল কাঁপত এক অদৃশ্য জল্লাদ বাহিনীর ভয়ে!আজ থেকে প্রায় দুইশো বছর আগে, ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী কিংবা শহরের উপকণ্ঠের ঘন জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় একদল সাধারণ মুসাফির বা বণিকের দেখা মিলত। তারা আপনার সাথে গল্প করত, একসাথে রান্না করে খেত, আর রাতে ঘুমানোর সময় হঠাৎ— একটি হলুদ রুমাল বা কাপড়ের টুকরো পেঁচিয়ে ধরত আপনার গলায়! মাত্র কয়েক সেকেন্ডে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশের বুক চিরে নদী বা মাটির নিচে পুঁতে ফেলা হতো। এরাই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত এবং খুনে বাহিনী— ‘ঠগি’ বা ‘ফাঁসিগাড়’।
১. ঢাকার নদীপথ ও জঙ্গলে ঠগীদের মরণফাঁদ:মোগল সাম্রাজ্যের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের শুরুর দিকে পুরো ঢাকা অঞ্চলে এক ধরণের প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। এই সুযোগে ঢাকার ধামরাই, সাভারের জঙ্গল এবং বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর মোহনায় ছদ্মবেশী ঠগীদের উপদ্রব মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। তারা মূলত ধনী ব্যবসায়ী, তীর্থযাত্রী এবং সরকারি ডাক বহনকারীদের টার্গেট করত।
২. হলুদ রুমালের সেই রক্তহিম করা কৌশল:ঠগীদের হত্যা করার পদ্ধতি ছিল আলাদা। তারা কখনোই রক্তপাত করত না। তাদের অস্ত্রের নাম ছিল ‘রুমাল’ বা ‘পিলখনা’ (এক ধরণের বিশেষ শক্ত কাপড় যার এক প্রান্তে মুদ্রা বা পাথর বাঁধা থাকত)। তারা প্রথমে মুসাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করত, কখনো কখনো নিজেদের সাধু বা দরবেশ পরিচয় দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করত। এরপর গভীর রাতে বা নির্জন রাস্তায় সংকেত পেলেই চোখের পলকে রুমালের ফাঁসে শিকারকে হত্যা করত। হত্যার পর লাশের পেট চিরে ফেলা হতো যাতে নদীতে ভাসিয়ে দিলে লাশ ফুলে ওপরে ভেসে না ওঠে!
৩. ঢাকার ক্যাপ্টেন স্লিম্যানের সেই মহা-অভিযান: ঠগীদের এই অদৃশ্য আতঙ্কে যখন ঢাকার বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন ব্রিটিশ সরকার এই খুনে নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে পাঠায় তুখোড় অফিসার ক্যাপ্টেন উইলিয়াম স্লিম্যানকে (William Sleeman)। তিনি ১৮৩০-এর দশকে ঢাকায় আসেন এবং তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জাজ রেকর্ড খতিয়ে দেখে এক বিশাল গোয়েন্দা জাল বিছান। স্লিম্যান সাহেব ছদ্মবেশে নিজের সেনাদের মুসাফির সাজিয়ে ঢাকার নদী ও জঙ্গলে পাঠান। একে একে গ্রেফতার করা হয় শত শত ঠগীকে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ঢাকার আনাচে-কানাচে মাটি খুঁড়ে এবং নদীর তলদেশ থেকে উদ্ধার করা হয় শত শত কঙ্কাল!
☠️ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সিরিয়াল কিলার বাহিনী:গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, এই ঠগি বাহিনী পুরো ভারতজুড়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছিল, যার একটি বড় অংশ ঘটেছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোতে। ১৮৪০ সালের মধ্যে ক্যাপ্টেন স্লিম্যানের অনবদ্য অভিযানে ঢাকার বুক থেকে এই কুখ্যাত ঠগি সাম্রাজ্য চিরতরে নির্মূল হয়ে যায়।
আজকের শান্ত বুড়িগঙ্গা কিংবা ঢাকার রাজপথের নিচে চাপা পড়ে আছে শত বছর আগের এই অন্ধকার আর রক্তহিম করা ইতিহাস।বাংলার এই ‘ডার্ক হিস্ট্রি’ নিয়ে আপনার মতামত কী? কমেন্টে জানান আমাদের! 👇
📚 তথ্যসূত্র (Sources):
১. The Thugs or Phansigars of India – Captain William Sleeman (1839).
২. Notes on the Races, Castes and Trades of Eastern Bengal – Dr. James Wise.
৩. ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জাজমেন্ট রেকর্ডস ও কোম্পানি আমলের পুলিশি আর্কাইভ (১৮৩০-১৮৪০)।
📸 চিত্র পরিচিতি ও সৌজন্য:
ছবি: কোম্পানি আমলে ঢাকার নদীপথে ছদ্মবেশী ঠগীদের শ্বাসরোধ করে হত্যার একটি কাল্পনিক এআই (AI) চিত্র।
তথ্য ঋণ: মো: সায়মন হোসেন।
বি.দ্র.
ইতিহাসের ঝরোকা পেজ থেকে সায়মন হোসেন এর অনুমতি ক্রমে নিউজটি কপি করা। প্রতিবেদক,সায়মন হোসেন একজন লেখক ও ইতিহাস সংরক্ষক।ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য পাঠকের সামনে তুলে ধরে ইতোমধ্যে তিনি অনেক সুনাম অর্জন করছেন। “ইতিহাসের ঝরোকা পেজ” এর এডমিন হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
