বৃহস্পতিবার, 29 অক্টোবর 2026 · 00:20
সত্য ও ন্যায়ের পথে আপসহীনজনতার কণ্ঠস্বর, মানুষের খবর

লে. কর্নেল মাহফুজুর রহমান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী।

হাসান কবির: আব্দুল্লাহ আল নোমান – প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করে বললেন, এটা নিয়ে ভাববেন না। আগামী তিন মাসের মধ্যেই সবাইকে নিয়ে বিএনপি দেশ গঠন করবে। শুধু দলের নেতা-কর্মীই নয়, অন্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দেশ গঠনে কাজে লাগাতে হবে। এই বলে তিনি সার্কিট হাউসের দোতলায় খাবার টেবিলে যান। রাষ্ট্রপতির পিএস কর্নেল মাহফুজকে তখন […]

হাসান কবির:

আব্দুল্লাহ আল নোমান – প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করে বললেন, এটা নিয়ে ভাববেন না। আগামী তিন মাসের মধ্যেই সবাইকে নিয়ে বিএনপি দেশ গঠন করবে। শুধু দলের নেতা-কর্মীই নয়, অন্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দেশ গঠনে কাজে লাগাতে হবে। এই বলে তিনি সার্কিট হাউসের দোতলায় খাবার টেবিলে যান। রাষ্ট্রপতির পিএস কর্নেল মাহফুজকে তখন খুবই অস্থির দেখাচ্ছিল। আমাকে মাহফুজ বারবার বলছিলেন, স্যার এখন ডিনারে যাবেন। আমিও তখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছি। এ সময় সেখানে থাকা মেজর হাফিজকে চিন্তিত অবস্থায় দেখতে পাই। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি সেদিন।

নায়েক মোঃ সারোয়ার হোসেন – ১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রথম প্রহরের পর পরই ২০/৩০ জনের একটি সেনাদল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রবেশ করেন। জোয়ানরা সেনা বাহিনীর পোষাক পড়া থাকলেও তাদের কারো নামফলক ব্যাজ ছিলো না। অধিকাংশের পায়ে ছিলো সাধারন কেডস হাতে চাইনিজ স্বয়ংক্রিয় সাব মেশিন গান। গেটে পুলিশ সদস্যরা তাদের প্রবেশে আপত্তি করতেই গুলী করে হত্যা করা হয় দুলাল নামে এক পুলিশ কনস্টেবলকে, এরপর অন্য পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলী করে মূহুর্তেই সিড়ি বেয়ে দোতালায় উঠে যান সৈনিকরা। গুলির শব্দ পেয়ে ২য় তলার ২নং (সম্ভবত) কক্ষে থাকা তৎকালীন দেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রুম থেকে বের হয়ে আসেন। তারই নিরাপত্তায় থাকা কর্ণেল মাহফুজের কাছে গোলাগুলি’র কারণ জানতে চেয়ে মাহফুজের হাতে থাকা অস্ত্রটি তিনি চাইলেই তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এ সময় রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে দুই পক্ষের গোলাগুলি হয়। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরপরই কর্ণেল মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন জামিল ওয়াকি টকিতে বারবার কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন। সব ঘটনাই ঘটে গেল আধ থেকে পৌনে একঘন্টা সময়ের মধ্যে। নিঃস্তব্দ হয়ে গেল গোটা সার্কিট হাউজ। সেই রাতে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই কর্ণেল মাহফুজের নেতৃত্বে সৈনিকরা ত্রিপল দিয়ে জিয়ার লাশটি পেঁচিয়ে সেনাবাহিনীর ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়।

এক এন এস আই কর্মকর্তার জবানবন্দি যে রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকান্ডের এক প্রত্যক্ষদর্শী – ৩০ মে, ১৯৮১ প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির রাতে, কিছু জুনিয়র সেনা অফিসার সার্কিট হাউসে আসে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যেতে। উপরের সিঁড়িতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় কর্নেল এহসান ও মেজর হাফিজ। ঠিক তখন পেছন থেকে দু’জন অফিসারকেই খুব কাছে থেকে গুলি করে হত্যা করেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার পিএস কর্নেল মাহফুজ। তারপর কর্নেল মাহফুজ প্রেসিডেন্ট জিয়ার দরজায় নক করে এবং জানায় সবকিছু ঠিক আছে স্যার। রাষ্ট্রপতি জিয়া সামান্য একটু দরজা খুলে উকি দিলে মাহফুজ রুমের দরজায় সজোরে লাথি দিয়ে দরজাটা সম্পূর্ণ খুলে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে টেনে হিঁচড়ে রুমের বাইরে নিয়ে আসে ও তার উপরে হাতের স্টেনগানের পুরা ম্যাগাজিনটি খালী করে, গুলি করার সময় রাষ্ট্রপতি জিয়া দুবার চিৎকার করে বলে উঠেন, “মাহফুজ, মাহফুজ”।

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী – আমি যখন সার্কিট হাউজের কম্পাউন্ডে বিভাগীয় কমিশনার এবং অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তার সাথে যোগদান করলাম, আমি তখন দেখলাম লে কর্নেল মাহফুজ সার্কিট হাউজ থেকে পরিপূর্ন সামরিক পোশাক পড়ে বের হচ্ছেন হাতে ছিল তার ওয়ারলেস। তিনি আঙ্গিনার সামনে দাঁড়ালেন যা কিনা আমাদের থেকে ৫০ গজ দূরে এবং ওয়্যারলেসে কথা বলছিলেন। আমরা তার কথা শুনতে পায়নি কারণ তার কথাবার্তা আমাদের শোনার সীমারেখার বাইরে ছিল। কিছু সময়ের পর তিনি আমাদের সাথে যোগ দিলেন এরপর আমাদের কাছে এসে গম্ভীরভাবে জানালেন, তিনি সেনাপ্রধান লে.জে.এইচ. এম. এরশাদ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে কথা বলছিলেন। মাহফুজ উল্লেখ করেন তিনি সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ নিতে আসতে বলেছেন। মাহফুজ আরও নিশ্চিত করেন সেনাপ্রধান লে.জে.এইচ. এম. এরশাদ হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম আসতে রাজি হয়েছেন। আর তার সঙ্গে থাকবেন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান।

ওই সময় লে. কর্নেল মাহফুজ ছিলেন খুবই শান্ত, ধীর-স্থির। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকান্ড ও সেনা অভ্যুত্থান সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলেননি। তবে খুবই নির্লিপ্তভাবে বলেছেন, তার কক্ষেও গুলি করা হয়। তবে তিনি বিছানার নিচে লুকিয়ে থেকে, পরে সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন। এরপর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে মাহফুজ তার কক্ষের ভেতরে গুলির চিহ্ন সবাইকে দেখান। কিন্তু তিনি তার কক্ষের দরজায় কোনো গুলির চিহ্ন দেখাতে পারেননি। মাহফুজের ঠান্ডা ব্যবহার এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা যা সে বলেছে জেনারেল এরশাদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তারা নাকি চট্টগ্রামে আসার পথে আমাদের মাঝে এটা একটা ধাধা সৃষ্টি করলো যার শেষ খুজে পাচ্ছিলাম না। তার মানে এই যে, আমাদের একটা ধারনা বাদ দিতে হবে যে এটা ছিল এক সামরিক অভ্যুত্থান যা কিনা ঢাকা থেকে করা হয়েছিল। যদি এটা সামরিক অভ্যুত্থান হয় তাহলে কিভাবে তারা দুইজন কিভাবে একসাথে থাকতে পাড়ে অথবা অন্তত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? সাইফুদ্দিন রাষ্ট্রপতি স্টাফদের থাকবার ব্যবস্থা তার নিজস্ব বাড়িতে করতে চাইলেন। এটা দেখে খুবই কৌতুহল হলাম যে মাহফুজ সার্কিট হাউজ ত্যাগ করতে রাজি হলেন তিনি আগে বলেছিলেন যে, জেনারেল এরশাদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হেলিকপ্টার করে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আসছে। কর্নেল মাহফুজ সার্কিট হাউজ ত্যাগ করলেন বিভাগীয় কমিশনার, লে কর্ণেল মাহতাব রাষ্ট্রপতি জিয়ার ব্যাক্তিগত চিকিৎসক এবং রাষ্ট্রপতির এডিসির সাথে বিভাগীয় বিভাগীয় কমিশনারের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজের ভূমিকা আমার কাছে খুব আশ্চর্য মনে হয়েছে। তিনি এই সময় অত্যন্ত শান্ত ছিলেন। তার সামরিক ইউনিফর্মও পড়া ছিলেন। আমাদের দেখে বেরিয়ে আসার সময় তিনি বেতার ফোনে কথা বলছিলেন। খুব শান্ত গলায় জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছেন। তার মেজাজের প্রশান্তি দেখে মনে হচ্ছিল না যে এখানে কোনো বিপর্যয় ঘটেছে।

চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে সেনা অফিসাররা সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের যে সদস্যরা জীবিত আছেন তাদের ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাবার জন্য আসে। কর্নেল মাহফুজ ফিল্ড ইন্টিলিজেন্স সেলে ৩০ মে , ১৯৮১ – ১ জুন, ১৯৮১ পর্যন্ত বন্দি রাখা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ নিয়ে তিনি ঢাকায় যান। ঢাকায় গিয়ে তিনি কিছু মানুষের সাথে জিয়া হত্যার ব্যাপারে কথাবার্তা বলেছেন যা সেনাপ্রধান এরশাদের কানে আসে। সেনাপ্রধান এরশাদ ডিজিএফআইয়ের কর্নেল আশরাফ হোসেনকে বলেন Look after this chatterbox. সেনাপ্রধান এরশাদ ডিজিএফআইয়ের কর্নেল আশরাফ হোসেনকে দায়িত্ব দেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করবার জন্য। কর্নেল আশরাফ হোসেন রাষ্ট্রপতির ব্যাক্তিগত সচিব লে কর্নেল মাহফুজুর রহমানকে নিযুক্ত করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করবার জন্য। সে সময় ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল মহাব্বত জান চৌধুরী।

কর্নেল মাহফুজুর রহমানের ভাতিজা মাসুম রহমানের জবানবন্দি – ৪ জুন, ১৯৮১ সালে তাকে প্রথমে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়, ১৭ দিন আটক রাখবার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া। আবার তাকে ৪ জুলাই, ১৯৮১ পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহ মামলায় যেখানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয় সেই অভিযোগপত্র এবং কোর্ট মার্শালের কাগজে কোথাও কর্নেল মাহফুজের নাম ছিল না। এমনকি যখন কোর্ট মার্শাল আরম্ভ হয় তখনো কর্নেল মাহফুজের বিরুদ্ধে কোন চার্জশীট ছিলো না। চট্টগ্রাম সেনাবিদ্রোহ মামলার চার্জশীট এবং অভিযোগ নামায় যে অফিসারদের নাম ছিল তাতে কর্নেল মাহফুজের নাম ছিল না। ৩ রা জুলাই পর্যন্ত কোর্ট অব ইনকোয়ারি করা হলো সেখানে এক মাসে তাকে অভিযুক্ত করা হলো না। ৪ জুলাই ১৯৮১ সেনাপ্রধান এরশাদ আরেকটি ফরমান জারি করেন সেখানে বলা হয় অভিযুক্তদের বিচার করার জন্য আদালত গঠন করা হয়। সেখানে অভিযুক্তদের একটি তালিকা প্রদান করা হয় এই তালিকায় কর্নেল মাহফুজের নাম অন্তভুক্ত ছিলো। যেখানে এক মাসের কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে এবং মামলার চার্জশীটে কর্নেল মাহফুজের নাম ছিলো না সেখানে এক রাতের ভিতরে কিভাবে তার নাম এই তালিকায় অন্তভুক্ত হলো। যেহেতু কর্নেল মাহফুজের বিরুদ্ধে কোন চার্জশীট ছিলো না বিধায় ৪ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত কোর্ট মুলতবী ঘোষণা করা হয়। তারপর কর্নেল মাহফুজকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্নেল মাহফুজের যে বিচার হচ্ছে এই ব্যাপারে আমরা পরিবারের সবাই সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম।

উল্লেখ্য যে, দেশদ্রোহীতার মামলায় অভিযুক্ত ফাঁসিতে দণ্ডপ্রাপ্ত কর্নেল মাহফুজের তিন ছেলের মধ্যে দুই জন সেনাবাহিনীতে এবং একজন বিমানবাহিনীতে কর্মরত। প্রশ্ন জাগে কিভাবে দেশদ্রোহীর সন্তানরা সশস্ত্র বাহিনীতে চাকরী পায়? কর্নেল মাহফুজের তিন ছেলেকে সশস্ত্র বাহিনীতে চাকুরী দেন এইচ এম এরশাদ।
কপিঃ Aminur Rahman
ছবি:সংগৃহিত।