নরসিংদীতে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জরুরি সভা!
26 Aug 2026 • ক্রাইম ডায়েরি

ক্রাইম ডেস্ক|জনতার দেশ:
ঢাকা সিলেট মহাসড়ক উন্নীতকরণ প্রকল্প নরসিংদী অংশে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রধান নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় উচ্চ পর্যায়ের জরুরী সভা ডাকা হয়েছে।
নরসিংদীর সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) মাহমুদা বেগম এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভূমি অধিগ্রহণের সাশ্রয়ী সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার রহস্য জট নিরসন সহ প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির রহস্য উন্মোচন
করতে গত রোববার ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সভাকক্ষে এক বৈঠকী অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভার নোটিশে ভূমি মন্ত্রণালয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সড়কও জনপদ অধিদপ্তর, এবং নরসিংদী জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভূমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক জটিলতা অর্থ ছাড়ে ধীরগতি এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে নরসিংদী অংশে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে ফলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
সওজ (সড়ক ও জনপথ) তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২০১ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে নরসিংদী অংশে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা রয়েছে।এই অংশে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য আটটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি মামলার বিপরীতে অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়েছে, বাকি মামলাগুলোর প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা নিরসন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান সহ প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
*সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়’ নিয়ে বিতর্ক*
নরসিংদী অংশের ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে আলোচনায় রয়েছে সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মাহমুদা বেগমের দেওয়া একটি হিসাবও। মাহমুদা, দাবি করেছিলেন নরসিংদী অংশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পুরো
প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ই প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে একটি জেলার অংশে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের দাবী নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা ক্ষোভ ও আন্দোলন হয়। যার ফলশ্রুতিতে এডিসি,মাহমুদাকে তিন তিনবার বদলি করা হলেও নানান অজুহাতে এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তিনি নরসিংদীতে থেকে যান। গত ১৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মাহমুদা বেগমকে পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বদলি করা হয়।
এর আগে তাকে ঘিরে নরসিংদী জেলা প্রশাসনে বিক্ষোভ ঝাঁড়ু মিছিলের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে একাধিকবার বদলির আদেশ হলেও বিভিন্ন কারণে সেসব আদেশ বাতিল বা কার্যকর হয়নি। এবারের আদেশ নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
*প্রশ্নবিদ্ধ তদন্ত প্রতিবেদন*
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে’ ভূমি অধিগ্রহণ ও অন্যান্য জটিলতা তদন্তে একাধিকবার কমিটি গঠন করা হলেও এসব কমিটির কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। এ সুযোগে মাহমুদা বেগম নিজ উদ্যোগে একটি লিখিত প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কাছে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই প্রতিবেদনে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায় ও দোষ চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের আপত্তির কারণে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত ভাবে গ্রহণ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
*ভুক্তভোগীদের স্হাপনার ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ*
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভুক্তভোগীদের কয়েকজনও মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগী আব্দুর রউফ, গাজী মানিক, গাজী শামসুল আলম খান, হারনুর রশিদ খানের দাবি, তারা ক্ষতিপূরণের অর্থ পেলেও স্হাপনার ক্ষতিপূরণের অর্থ এখনো পাননি।
তাদের অভিযোগ আমরা জমির বিল পেয়েছি,কিন্তু এখনো স্থাপনার বিল পাইনি। হাইকোর্টের আদেশ থাকার পরও নানা অজুহাতে বিল দেওয়া হয়নি। এতে আমরা আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
তাদের আরো অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করতে মাহমুদা বেগমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু ব্যক্তি তৎপর ছিলেন।
এ ছাড়া মাহমুদা বেগম ও সাবেক জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন রিংকুর স্ত্রীকে ঘিরে স্বর্ণের দোকান থেকে পণ্য নেওয়ার পর মূল্য পরিশোধ না করা এবং অধীনস্থ কর্মচারীদের মাধ্যমে কুরিয়ার বিল পরিশোধ না করারও অভিযোগ ওঠেছে।
*বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ*
ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক) ডিজিএফআই, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার কথা জানা গেছে।
অভিযোগ কারীদের দাবি, ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন।
*মাহমুদা বেগমের আওয়ামী কানেকশন*
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে দুর্দান্ত প্রতাপ শালী ছিলেন এই মাহমুদা বেগম। ইতো পূর্বে তিনি চট্টগ্রামের চন্দনাইশে ইউএনও থাকাকালীন আওয়ামী রাজনীতির প্রভাব খাঁটিয়ে অনেক অনিয়ম দুর্নীতি করেছেন বলে জানা গেছে।মাহমুদা, যে সকল স্টেশনে কাজ করেছেন সেখানেই তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন। তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক লাঞ্ছিত হয়েছেন। এই সরকারের শুরুতেই তিনি নরসিংদীতে ঢাকা সিলেট মহাসড়কের কাজ বন্ধ করে ঘাপলা বাঁধিয়ে অসন্তোষ তৈরি করেছেন। এতে করে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে করেন সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী মদদপুষ্ট এই কর্মকর্তার নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে নরসিংদী থেকে সরানোর জন্য স্থানীয় সরকার দলীয় এক সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
*মাহমুদা বেগমের বক্তব্য*
অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেন। তবে তার বিরুদ্ধে এতগুলো অভিযোগ ও আন্দোলন হলো এমনকি তার দপ্তরের অধীনস্থ কর্মচারীরা তার বিরুদ্ধে কেন মুখ খুললেন এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
*সমন্বয় সভায় নজরদারি*
এখন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের জরুরি সভাকে ঘিরে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সভায় ভুমি অধিগ্রহণের আটটি মামলা ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাড় প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের নরসিংদী অংশের দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে কার্যকর সিদ্ধান্ত হলে ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং কাজে গতি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে অতীতে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সরকারি নথি পত্রের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হবে বলে আশাবাদী ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।
তথ্য ঋণ
মো: মাজহারুল পারভেজ,ব্যবস্হাপনা সম্পাদক দৈনিক “নিখাঁদ খবর”।
