মো: সায়মন হোসেন
ছবি: এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি ১৯ শতকের জমজমাট ও বৈভবশালী পানাম নগরীর আসল ছবি থেকে creat করা।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত ‘পানাম নগর’-এ আমরা কমবেশি সবাই গিয়েছি। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৫২টি জরাজীর্ণ আলিশান প্রাসাদ আমাদের মুগ্ধ করে।
কিন্তু আপনি কি জানেন, আন্তর্জাতিক ট্রাভেল গাইডগুলো এই স্থানটিকে কেন বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় ‘ঘোস্ট সিটি’ বা মৃত শহর বলে চেনে? এক রাতের মধ্যে কীভাবে এই বিলাসবহুল শহরের সমস্ত মানুষ উধাও হয়ে গিয়েছিল?
আজ আমরা জানবো পানাম নগরের ইট-পাথরে মিশে থাকা এক বুক কাঁপানো ট্র্যাজেডির ইতিহাস।
💰 তৎকালীন বাংলার সবচেয়ে ধনী এলাকা:উনিশ শতকের দিকে ব্রিটিশ আমলে কলকাতার একদল অত্যন্ত ধনী হিন্দু কাপড়ের ব্যবসায়ী (বণিক) তাদের পূর্বপুরুষদের ভিটে সোনারগাঁওয়ে ফিরে আসেন। তারা মসলিন ও নীল ব্যবসার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলেন এই পানাম নগরে। মাত্র ৬০০ মিটার দীর্ঘ একটি রাস্তার দুই পাশে ইউরোপীয় এবং মুঘল স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি হয় ৫২টি বিলাসবহুল প্রাসাদ। তখনকার দিনে এই শহরের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা এতটাই লাক্সারিয়াস ছিল যে পুরো পূর্ব বাংলায় এর কোনো তুলনা ছিল না।
⚔️ ১৯৬৫ সালের সেই অভিশপ্ত রাত:শহরটি চমৎকারভাবে চলছিল, কিন্তু ১৯৬৪ ও ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এক রাতে দাঙ্গার আগুন পানাম নগরের দোরগোড়ায় চলে আসে। প্রাণভয়ে আতঙ্কিত হয়ে এই ধনী বণিকেরা তাদের কোটি কোটি টাকার সোনাদানা, হীরা, আসবাবপত্র এবং সাজানো গোছানো আলিশান অট্টালিকাগুলো যে অবস্থায় ছিল, ঠিক সেভাবেই ফেলে রেখে মাঝরাতে স্রেফ এক কাপড়ে ভারতের দিকে পালিয়ে যান।
যদিও আমরা এক রাতের কথা বলছি রূপক অর্থে — এই এক রাতের পূর্ণ অর্থ পানাম নগরীর হিন্দু ব্যবসায়ীদের বড় অংশটি আসলে দেশত্যাগ করা শুরু করেছিলেন ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের সময় এবং পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময়। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় বাকি থাকা পরিবারগুলোও চলে যায় এক রাতের মধ্যে।
🔑 “আমরা কয়েকদিন পরেই ফিরে আসব…”পালিয়ে যাওয়ার সময় অনেক বাড়ির মালিক তাদের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার হাতে ঘরের চাবি দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেছিলেন, “যুদ্ধ থামলে পরিস্থিতি ঠিক হলেই আমরা আবার ফিরে আসব, আমাদের ঘরগুলো দেখে রেখো।” কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারেননি। এক রাতের মধ্যেই এক জমজমাট আলো ঝলমলে শহর পরিণত হয় সম্পূর্ণ জনমানবহীন এক ভৌতিক ও নিস্তব্ধ ধ্বংসস্তূপে।
🌍 বিশ্বের ১০০টি ধ্বংসপ্রায় শহরের একটি:পরবর্তী সময়ে এই পরিত্যক্ত বাড়িগুলো অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে যায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধসে পড়তে থাকে। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা World Monument Fund (WMF) পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন ১০০টি ঐতিহাসিক স্থানের তালিকায় এই পানাম নগরকে অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে ২০০০ সালের পর বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে একটি সংরক্ষিত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে।
স্থাপত্যের বৈচিত্র্য: ভবনগুলোতে যে শুধু ইউরোপীয় ছোঁয়া আছে তা নয়, এতে ব্যবহৃত ‘কাস্ট আয়রন’ এর গ্রিল, বেলজিয়ামের রঙিন কাচ এবং মেঝেতে ‘ছিনিটিকরি’ (চিনামাটির ভাঙা টুকরো দিয়ে করা মোজাইক) নকশার কথা হালকা ছুঁয়ে যেতে পারেন।
পাসপোর্ট ও নকশা: তৎকালীন সময়ে এই ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি এত বেশি ছিল যে, অনেকের ঘরেই তখনকার আমলের পারমিট বা পাসপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল, যা তাদের বৈশ্বিক যোগাযোগের প্রমাণ দেয়।
আজ আমরা যখন পানাম নগরের লাল ইটের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাই, চারপাশের এই অদ্ভুত নীরবতা আসলে কোনো সৌন্দর্য নয়; এটি এক থেকে দেড়শো বছর ধরে বুকচাপা কান্না বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার দীর্ঘশ্বাস।
পরের বার যখন পানাম নগরে যাবেন, এই জরাজীর্ণ বারান্দাগুলোর দিকে তাকালে কি এক রাতের মধ্যে ঘরছাড়া হওয়া সেই হতভাগ্য মানুষদের কথা আপনার মনে পড়বে না? কমেন্টে জানান!
📖 তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স (কমেন্টে দেওয়ার জন্য):
১. উইকিপিডিয়া (Wikipedia): ‘Panam Nagar’ (The Partition & Abandonment section)।
২. অ্যাটলাস অবসকিউরা (Atlas Obscura): “Panam Nagar in Sonargaon: Ghost City and City of the Dead” শীর্ষক আন্তর্জাতিক ডকুমেন্টেশন।
৩. ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড (World Monuments Fund): ২০০৬ সালের বিপন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার অফিশিয়াল তালিকা Sonarga.
তথ্যঋন: মোঃ সায়মন হোসেন ( বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ,লেখক,গবেষক ও প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষক)।
বি.দ্র. ইতিহাস বিদ সায়মন হোসেন এর অনুমতি ক্রমে তাঁর” ইতিহাসের ঝরোকা পেজ” থেকে নিউজটি কপি করা।
