বৃহস্পতিবার, 29 অক্টোবর 2026 · 00:16
সত্য ও ন্যায়ের পথে আপসহীনজনতার কণ্ঠস্বর, মানুষের খবর

ব্রিলিয়ান্ট কর্মকর্তা হলেও আইনের ঊর্ধ্বে নন সম্পদ, ভূমিকা ও রাজনৈতিক আনুগত্যের স্বচ্ছ হিসাব দিতে হবে।

সৈয়দ আবু নাসের সাবের: মেধা সম্মানের, কিন্তু জবাবদিহি অনিবার্য !!!! জনাব মনিরুল ইসলাম, অত্যন্ত দরিদ্র ও সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে মেধা, পরিশ্রম এবং পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। আপনার পেশাগত মেধা বা যোগ্যতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচে মেধাতালিকায় […]

সৈয়দ আবু নাসের সাবের:

মেধা সম্মানের, কিন্তু জবাবদিহি অনিবার্য !!!!
জনাব মনিরুল ইসলাম, অত্যন্ত দরিদ্র ও সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে মেধা, পরিশ্রম এবং পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। আপনার পেশাগত মেধা বা যোগ্যতাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
১৫তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচে মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন, ডিবি, সিটিটিসি ও এসবির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন—এসবই আপনার পেশাগত সক্ষমতার পরিচয় বহন করে। ২০২১ সালে আপনি এসবির প্রধান হন এবং ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
আপনার একজন কোর্সমেট, যিনি আমার অত্যন্ত পরিচিত, তিনি আমার বাসায় আমার সামনেই আপনাকে একজন ভালো, মেধাবী এবং অন্যভাবে বললে একজন ব্রিলিয়ান্ট পুলিশ অফিসার হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন। তাঁর সেই মূল্যায়নকে আমি সম্মান করি। তবে একজন কর্মকর্তা মেধাবী বা দক্ষ হলেই তাঁর সব বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড আইনি এবং নৈতিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে যায় না। বরং পদ, ক্ষমতা ও প্রভাব যত বড়, জবাবদিহির পরিধিও তত বড় হওয়া উচিত।
আপনার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ, জমি, ফ্ল্যাট, এনজিও, বিদেশি সম্পত্তি কিংবা ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব নিয়ে যেসব অভিযোগ প্রচারিত হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী প্রমাণের চূড়ান্ত দলিল নয়। একইভাবে নিজের ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ অস্বীকার করাও নির্দোষতার আইনি প্রমাণ নয়।
আপনি যখন নিজেই প্রকাশ্যে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন, তখন বিষয়টি কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনের শাসনের আওতায় আনাই উচিত। আপনার ও আপনার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, জমি, ফ্ল্যাট, ব্যবসা, দেশি-বিদেশি আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক; আর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আপনার পদমর্যাদা বা অতীতের অর্জন বিবেচনা না করে প্রচলিত আইনে কঠোর বিচার নিশ্চিত করা হোক।
তবে আপনার দীর্ঘ আত্মপক্ষ সমর্থনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালে এসবি প্রধান হিসেবে আপনার একটি বক্তব্য প্রকাশ্যে দলীয় ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচিত হয়েছিল।
সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায়, বিশেষ করে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে আপনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেটি একজন নিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তার বক্তব্যের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতার বক্তব্যের মতো শোনাল কেন?
আপনার সেই বক্তব্য কোন সাংবিধানিক মূল্যবোধ, প্রশাসনিক নীতি বা পেশাগত নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল—জাতির সামনে এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একজন সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করতেই পারেন; কিন্তু চাকরিরত অবস্থায় রাষ্ট্রীয় পদ ও পরিচয় ব্যবহার করে কোনো দলের পক্ষে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া গুরুতর নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন সৃষ্টি করে।
আপনি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার পর একই বক্তব্য দিলে সেটি আপনার রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু সরকারি চাকরিতে থেকে দলীয় নেতার মতো বক্তব্য প্রদান করলে তা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর নিরপেক্ষতার শপথ, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সেটিও তদন্ত ও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
আপনি দাবি করেছেন, অর্থের প্রতি লালসা থাকলে আরও প্রভাবশালী পদে গিয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু কোনো সুযোগ গ্রহণ না করার দাবি দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আবার আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের জবাব দিয়েও রাজনৈতিক পক্ষপাত, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থেকে দায়মুক্ত হওয়া যায় না। প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে প্রমাণ, নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে।
একজন মানুষ আর্থিকভাবে সৎ হয়েও রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন। আবার একজন মেধাবী কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগে অন্যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই শুধু মেধা, ভালো পারিবারিক পটভূমি, দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা কিংবা সহকর্মীদের প্রশংসা কাউকে আইনি জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না।
আপনার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অবৈধ সম্পদের যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতিটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী বলা ন্যায়সংগত নয়; কিন্তু সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়াও আইনের শাসনের পরিপন্থী।
আপনি বলেছেন, আপনার বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকলে জনতার আদালতে বিচার হোক। কিন্তু কোনো সভ্য রাষ্ট্রে জনতার আদালত, প্রতিশোধ বা আবেগের ভিত্তিতে বিচার হতে পারে না। বিচার হতে হবে দেশের প্রচলিত আইন, আদালত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোরতম বৈধ শাস্তি হবে; নির্দোষ প্রমাণিত হলে সম্মানের সঙ্গে অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবেন।
আইনের শাসনের মূলনীতি হলো—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য যে আইন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপির জন্যও সেই একই আইন প্রযোজ্য হতে হবে। আপনার মেধা ও পেশাগত অর্জনের মূল্যায়ন যেমন ইতিহাস করবে, তেমনি চাকরিরত অবস্থায় আপনার রাজনৈতিক বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার এবং আপনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হিসাব হতে হবে।
আত্মপক্ষ সমর্থন তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন শুধু সম্পদের অভিযোগ অস্বীকার করা নয়—নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা, নৈতিক অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের প্রশ্নগুলোরও স্পষ্ট ও প্রমাণনির্ভর উত্তর দেওয়া হয়।
মেধার স্বীকৃতি থাকবে, কিন্তু আইনের প্রশ্নে কোনো ছাড় নয়। নির্দোষ হলে প্রমাণের মাধ্যমে সম্মান ফিরে আসুক; আর অপরাধ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা নির্বিশেষে কঠোর আইনগত শাস্তি নিশ্চিত হোক।