পুলিশ প্রশাসনে ‘নারী বৈষম্য’ শীর্ষ ১০০ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র ১ জন নারী!
29 Aug 2026 • বাংলাদেশ পুলিশ।

মো: মাহবুবুর রহমান খান :
পুলিশের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ১২৬। মহাপরিদর্শক থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত ১৮ টি পদের চারটিতে কোন নারী নেই। শীর্ষ তিনটি পদে ১০০ কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র নারী মাত্র একজন। কর্মরত মোট সদস্যের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৯.১৩ শতাংশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী পুলিশের ১ লাখ ৯৬ হাজার ১২৬ জন সদস্যের মধ্যে পুরুষ এক লাখ ৭৮ হাজার ২১৩ জনের মধ্যে ১৭ হাজার ৯১৩ জন নারী। পুরুষের তুলনায় সে হিসেবে ৯.১৩ শতাংশ নারী সদস্য।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আইজিপি (গ্রেড- ওয়ান) পদে আছে দুইজন অতিরিক্ত আইজিপি গ্রেড -২ পদে আছেন ১৬ জন এবং চলতি দায়িত্বে আরো একজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনও নারী সদস্য নেই।
তবে ডিআইজি গ্রেড – ৩ পদে ৭৮ জনের মধ্যে আছেন মাত্র একজন নারী। ডিআইজি (সুপার নিউ মারারি) পদে আছেন আরো ২ পুরুষ সদস্য। অর্থাৎ শীর্ষ এই তিন পদে কর্মরত ১০০ জনের মধ্যে নারী মাত্র একজন।
বিসিএসে এর নিয়োগ পাওয়া পুলিশের (এএসপি) থেকে তদ উর্ধ্ব পদে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২ হাজার৬শত ৪৭ জন পূরুষ কর্মকর্তা। তার মধ্যে নারীর সংখ্যা৩০৩ জন। শতাংশের হিসাবে ১১ দশমিক ৪৪।
কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদে মোট সদস্য ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯ জন। এর মধ্যে নারী ১৭ হাজার ৬১০ যা শতাংশের হিসেবে ৯ দশমিক ১।
অতিরিক্ত ডিআইজি ১৬৩ জনের মধ্যে নারী পুলিশ সদস্য রয়েছেন ১৭ জন। অতিরিক্ত ডিআইজি পদে চলতি দায়িত্বে ১০ জনের মধ্যে নারী একজন। একই পদে ( সুপার নিউ মারারি) হিসাবে ১০৩ জনের মধ্যে নারী ১৫ জন। পুলিশ সুপার (এসপি) পদে কর্মরত ৪৬২ জনের মধ্যে নারী ৫৪ জন। আর এই পদে (সুপার নিউ মারারি) হিসাবে ৭১ জনের মধ্যে ২১ জন নারী রয়েছেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে ৮৭১ জনের মধ্যে নারী ১৩৯ জন। সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে ৮৪৬ জনের মধ্যে নারী ৫৫ জন মাত্র।
৫ আগস্ট এর পট পরিবর্তনের পর অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকজন নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়। এরমধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি পদের নারী কর্মকর্তা রয়েছেন । সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে ৭ নারী অতিরিক্ত ডিআইজিকে বাধ্যতা মূলক অবসর দেওয়া হয়েছে।
এসআই থেকে পরিদর্শক এই চার পদে নারী নেই। পরিদর্শক (টিটি),পরিদর্শক ( সশস্ত্র), ৪হাজার ৭১৯জনের
মধ্যে নারী, ১২৮ জন। পরিদর্শক টিটি পদে কর্মরত ৯৮৪ জন এবং পরিদর্শক সশস্ত্র পদে ৮৩৬ জন। এই দুই পদে কোন নারী নেই। উপ-পরিদর্শক এসআই নিরস্র পদে ১৯ হাজার ২০৪ জন পূরুষের বিপরীতে নারী ৯৯৮ জন।সার্জেন্ট পদে ২ হাজার ২৫ জনের মধ্যে নারী মাত্র ৯২ জন। বর্তমানে ৮৫ জন শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট রয়েছেন। টিএসআই পদে ৪৪৬ জন এবং(এটিএসআই) সশস্ত্র ২ হাজার ৯১৫ জনের মধ্যে কোন নারী নেই।
এ ছাড়া সরকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই নিরস্র) ২০ হাজার৬৩৮ জনের মধ্য নারীমাত্র ১৪২৭। এটিএসআই পদে দুই হাজারের মধ্যে নারী ২১।এএফআই সশস্ত্র ৬৮৫৭ জনের মধ্যে নারী ১৮৯।৭ হাজার ২০ জন নায়েকের মধ্যে নারী ৫২৭।১ লাখ ২৫ হাজার ৭৫০ কনস্টেবলের মধ্যে নারী ১৪২২৮ জন।
বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন্স নেটওয়ার্ক এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ পুলিশে নারীর আনুষ্ঠানিকযাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪
সেই বছর স্পেশাল ব্রাঞ্চে ১৪ নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়
তাদের মধ্যে ৭ জন উপ-পরিদর্শক (এসআই) এবং ৭ জন কনস্টেবল ছিলেন। অর্থাৎ পুলিশের এসআই ও কনস্টেবল এই দুই পদে নারীদের প্রথম নিয়োগ হয়। এরপর ১৯৭৬ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো ইউনিফরমধারী নারী পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়
ওই দফায় ১৫ নারী সদস্য নেওয়া হয়েছিল।
১৯৮৬ সালে পঞ্চম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের মাধ্যমে (এএসপি) হিসেবে নারীদের প্রথম নিয়োগ দেওয়া হয়। ফাতেমা বেগম দেশের প্রথম নারী বিসিএস পুলিশ ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম নারী অতিরিক্ত আইজিপি ছিলেন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে তাকে ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে অবসর নেন। এরপর রওশনারা বেগম ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান। ২০১৯ সালে কঙ্গুতে শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
পুলিশের নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে কোটা ও লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হয়েছিল। ২০১৮ সাল পর্যন্ত কোটা পদ্ধতিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে ২০১৮ সালের নিয়োগের কোটা পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়।
২০১১ সালে জনপ্রশাসনে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয় পুলিশে এএসপি থেকে তদুর্ধ পর্যায়ে নারীদের জন্য ১০% এবং কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদে ১৫% নিয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন সংসদে জানানো হয়, নারী এসআই নিয়োগে ১০% কোটা অনুসরণ করা হচ্ছে।
“ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন অফ উইমেন পুলিশ” (আইএডব্লিউপি) সেন্ট্রাল ও সাউথ এশিয়া কো-অর্ডিনেটর এবং ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন তখন সমকাল কে জানিয়েছিলেন, নারী এসআই কম হওয়ায় প্রতিটি থানায় সব ক্ষেত্রেই তদন্ত কর্মকর্তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে সকল থানাতেই নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী সার্ভিস ডেস্ক রয়েছে। যেখানে নারীরা নির্ভয়ে তাদের বিষয়গুলো বলতে পারেন।
নারী পুলিশ সদস্য কম থাকার বিষয়ে শামীমা পারভীন বলেন বলেন, কোটা পদ্ধতি না থাকায় নারীরা কাজে আসতে পারছেন না বা আসছেন না।
তবে নারী সদস্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়োগ হতে পারে বলে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ” বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর তানিয়া হক’ সমকালকে বলেন, আমাদের দেশে নারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি পুরুষের নিশ্চিত করার মানসিকতা রয়েছে। তাই নিরাপত্তা বাহিনীর কাজে নারীদের জন্য চিন্তা করা হয়নি। এসব সেক্টরে অনেক দেরিতে নারীরা যুক্ত হয়েছেন। এখনো নারীরা এসব কাজে যুক্ত না হওয়ার পেছনে আমাদের সমাজের মানসিকতা দায়ী। তাই নারীদের শুধু নারী হিসেবে নয় মানুষ হিসাবে সম্মান দেওয়া ও আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন দরকার। তাহলে এসব পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পুলিশের সহকারি মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ ক্যাডার অফিসারের সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের পদ গুলোতে নারীপুলিশ সদস্যদের সংখ্যা কম। আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামোর কারণেই হয়তো অনেকে এই পেশায় আসেন না।
তথ্যসূত্র:
# উইমেন এণ্ড জেণ্ডার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
#ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশ।
# দৈনিক প্রথম আলো।
# বিডিনিউজ টুয়েন্টি ফোর ডটকম
তথ্যঋণঃ
দৈনিক সমকাল।
প্রতিবেদক-
সম্পাদক- প্রকাশক
দৈনিক জনতার দেশ।
