একজন সৎ নীতিবান সন্ত্রাসীদের কাছে আতংকের মূর্ত প্রতীক জনবান্ধব পুলিশ অফিসার (ওসি)এর গল্প!
17 Sep 2026 • বাংলাদেশ পুলিশ।

আলম ডাঙ্গা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধিঃ
পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে এক সন্ত্রাসীর জীবন গেল। ভোরের আলো না ফুটতেই আলমডাঙ্গার বাতাসে যেন শান্তির একটা হিমেল পরশ বয়ে গেল।
এরপর আরও একটা।
তারপর আরও একটা।
তারপর আরও একটা।
বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় একেকজন সন্ত্রাসীর পতন হতে লাগলো। দীর্ঘ দিনের সন্ত্রাস কবলিত আলমডাঙ্গার মানুষ যেন ধীরে ধীরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করলো।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো সন্ত্রাসী সংগঠন ‘জনযুদ্ধ’। তাদের রোষানল গিয়ে পড়লো বন্দুকযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আলমডাঙ্গা থানার তৎকালীন ‘ওসি কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদের ওপর’। তাঁকে হত্যার জন্য তাঁর মাথার দাম নির্ধারণ করা হলো দশ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা।
কিন্তু কাজী জালাল পিছু হটলেন না। সন্ত্রাসের কাছে মাথা
নত করলেন না,ভয়কে ভয় পেলেন না।
বরং সন্ত্রাস নির্মূলে তিনি হয়ে এঠলেন আরও কঠোর, আরও দৃঢ়।
বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা বাড়তে লাগলো। একের পর এক সন্ত্রাসীর পতন হতে লাগলো। মোট কতজন—সেই সংখ্যাটা অগণিত।
তবে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে ওঠলো একটি বিষয়- আলমডাঙ্গার মানুষের মনে নিরাপত্তা।
মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সন্ত্রাসীদের কাছে আতঙ্কের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠলেন আলমডাঙ্গা থানার ওসি কাজী জালাল।
অপরদিকে,দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত আলমডাঙ্গা ধীরে ধীরে শান্তিপ্রিয় মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠলো।
কাজী জালালের কাজের ধরনও ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী।
তিনি প্রচুরসংখ্যক মোবাইলের সিম ব্যবহার করতেন। সেই সিমগুলো রাখতেন একটি গোপন ব্যাগে। বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা “ব্যোমকেশ বক্সীর” মতোই বিভিন্ন নম্বর ও পরিচয়ে তিনি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কখনও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতেন, কখনও তাদের আস্থা অর্জন করতেন। এরপর দেশের যে প্রান্তেই তারা আত্মগোপন করে থাকুক না কেন, কৌশলে তাদের গ্রেপ্তার করে আলমডাঙ্গায় নিয়ে আসতেন।
সন্ত্রাস দমনের পাশাপাশি আলমডাঙ্গার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
আলমডাঙ্গা থানা জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর কিছু ভূমিকা রয়েছে। চারদিক উন্মুক্ত থানা কম্পাউন্ডকে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে থানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন থানা মসজিদ মার্কেট।
তবে কাজী জালালের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর নৈতিক অবস্থান।
তিনি বলতেন-“দুইটা বিষয়ের সঙ্গে কখনও আপোষ করবেন না। সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো আপোষ নেই, ঘুষের সঙ্গেও কোনো আপোষ নেই।”
এই কথাগুলো শুধু বলার জন্য বলা নয়। তাঁর কর্মের মধ্যেও সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যেত।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন কঠোর। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন আপসহীন।
আর সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন আশ্রয় দেবতা।
একসময় যে আলমডাঙ্গার মানুষ সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পেতেন, যে জনপদ দীর্ঘদিন সন্ত্রাস আর রক্তপাতের আতঙ্কে কাঁপতো-সেই মানুষগুলোকে আবার শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ করে দিয়ে আড়াই বছর পর ২০০৯ সালে বদলি হয়ে যান ওসি কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ।
কর্মকর্তারা বদলি হন।
চেয়ার বদলে যায়।
সময় চলে যায়।
কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের মধ্য দিয়ে একটি জনপদের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে যান।
কাজী জালাল তাঁদেরই একজন।
নির্ভীক, অকুতোভয় এই পুলিশ অফিসার আজও আলমডাঙ্গাবাসীর অন্তরে রয়েছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন। কারণ তিনি শুধু অপরাধীদের কাছে ছিলেন আতঙ্কের নাম–সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক।
কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদের গল্প তাই শুধু একজন কঠোর পুলিশ কর্মকর্তার গল্প নয়। এটি একজন মানুষের সাহসের গল্প, নৈতিকতার গল্প, দায়িত্ববোধের গল্প এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ না করার গল্প।
অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা কাজী জালাল সংসার জীবনেও দারুণ সফল। স্ত্রী সরকারি চাকরি করেন। পৈতৃকভাবে বিত্তশালী পরিবারের সন্তান কাজী জালাল দু’জন কন্যা সন্তানের জনক। তারা দু’জনেই এমবিবিএস ডাক্তার।
পঁচিশ সালে চাকরি থেকে তিনি অবসরে গেছেন ঠিকই, কিন্তু আলমডাঙ্গার মানুষ এখনও তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করে।
ছবি: সংগৃহিত।
